যাদব চন্দ্র রায়একটি দেশের বৈচিত্র্য এবং সৌন্দর্য নির্ভর করে তার বহুমাত্রিক সংস্কৃতি, ভাষা ও জাতিসত্তার ওপর। বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবেই সমতল ও পাহাড়ের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য নৃগোষ্ঠীর মানুষ শত শত বছর ধরে বাস করে আসছেন। সাধারণ ভাষায় আমরা যাদের ‘আদিবাসী’ বলে চিনি, তাদের অধিকার, অস্তিত্ব এবং মর্যাদা রক্ষা করার ক্ষেত্রে আজ একটি বড় সংকট তৈরি হয়েছে। আর এই সংকটের মূল জায়গাটি হলো ‘আদিবাসী’ শব্দটির সঠিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ধারণার অভাব। যদি এ দেশের আপামর জনমানুষের মাঝে ‘আদিবাসী’ শব্দটির মূল চেতনা ও গভীরতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকত, তবে আজ হয়তো তারা নিজেদের অধিকার থেকে এতটা বঞ্চিত হতেন না।‘আদিবাসী’ কেবল একটি শব্দ নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়, ভূমি-অধিকার, নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই শব্দটির একটি নির্দিষ্ট আইনি ও মানবিক ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশে এই পরিচয়টিকে প্রায়শই পাশ কাটিয়ে যাওয়ার বা ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হয়। শব্দগত বা পরিচয়গত এই অস্পষ্টতার কারণে মাঠ পর্যায়ে সাধারণ আদিবাসী মানুষেরা তাদের মৌলিক অধিকারগুলো থেকে ক্রমাগত বঞ্চিত হচ্ছেন।বিশেষ করে সমতলের আদিবাসীদের অবস্থা আরও করুণ। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে, যেমন দিনাজপুর, নওগাঁ বা জয়পুরহাটে বিপুল সংখ্যক সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুণ্ডা, মালপাহাড়ীসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার। আদিবাসী শব্দ ও তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় নিচের ক্ষেত্রগুলোতে তারা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন:ভূমির অধিকার রক্ষা: আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতির প্রধান উৎস তাদের জমি। অথচ আইনি ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে তারা ক্রমাগত নিজেদের ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন।ভাষা ও সংস্কৃতির বিলুপ্তি: নিজস্ব ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে।সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা: পরিচয় ও অধিকারের সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় তারা প্রতিনিয়ত প্রান্তিকীকরণের শিকার হচ্ছেন, যা তাদের মূলধারার উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রাখছে।কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি), দিনাজপুর-এর পক্ষ থেকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে আসছি। আমরা বিশ্বাস করি, কেবল অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে তাদের 'আদিবাসী' পরিচয়ের সঠিক আইনি স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া।আদিবাসী শব্দটির পেছনের ঐতিহাসিক সত্যকে স্বীকার করে যদি রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের পাশে দাঁড়ায়, তবেই এই বঞ্চনার অবসান ঘটবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের একটি বড় অংশকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে সামগ্রিক বা টেকসই উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আসুন, আমরা আদিবাসীদের অধিকারের প্রতি সংবেদনশীল হই, তাদের স্বকীয়তাকে সম্মান করি এবং একটি বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে একসঙ্গে কাজ করি।লেখক:নির্বাহী পরিচালক,কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি), দিনাজপুর।