আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ও আমাদের করণীয়:... প্রবন্ধকার: যাদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর ও সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা ট্রাস্ট (BJSST), দিনাজপুর জেলা শাখা মোবাইল: ০১৭১৬৮৭৮৮৪৪, ই-মেইল: cdcdinajpur@yahoo.com ভূমিকা: একটি মানবিক ও প্রগতিশীল সমাজের অন্যতম প্রধান পরিমাপক হলো সেই সমাজে প্রবীণদের অবস্থান এবং তাঁদের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আচরণ। প্রবীণরা হলেন আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির জীবন্ত ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্যের বাহক এবং অভিজ্ঞতার এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। অথচ আধুনিক সভ্যতার ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা ও একক পরিবারের ধারণার প্রসারের ফলে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানসিক স্থিতিশীলতা আজ মারাত্মক সংকটের মুখে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতি বছর ১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। প্রবীণদের অধিকার রক্ষা, তাঁদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা এবং তাঁদের বার্ধক্যজনিত সমস্যাগুলো নিয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। দিবসের পটভূমি: ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯১ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। প্রবীণদের এই ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর জন্য যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করাই এই বিশেষ দিবসের মূল লক্ষ্য। প্রবীণদের বর্তমান সংকট: আমাদের প্রথাগত বাঙালি সমাজে একসময় যৌথ পরিবারের যে কাঠামো ছিল, তা প্রবীণদের জন্য এক অভয় অরণ্য ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও নগরায়ণের ফলে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। প্রবীণরা তাঁদের জীবনের শেষ সময়ে এসে চরম একাকীত্ব, অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা এবং স্বাস্থ্যহীনতায় ভোগেন। অনেক ক্ষেত্রে নিজ পরিবারেই তাঁরা অবহেলা ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। প্রবীণদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন, ডে-কেয়ার সেন্টার কিংবা মানসম্মত চিকিৎসাসেবার অভাব আমাদের সমাজ বাস্তবতার এক নিষ্ঠুর চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে। আমাদের দায়িত্ব ও করণীয়: প্রবীণরা সমাজ বা পরিবারের কোনো বোঝা নন, বরং তাঁরা আমাদের পথপ্রদর্শক। তাঁদের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের পাশাপাশি নাগরিক সংগঠনগুলোর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। ১. পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা: পরিবারে প্রবীণদের যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, যেন তাঁরা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে না করেন। ২. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা: প্রবীণদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সুলভ বা বিনামূল্যে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ৩. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: প্রবীণ ভাতা বা বয়স্ক ভাতার পরিধি ও পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। একই সাথে প্রবীণদের আইনি সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। ৪. বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগ: কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC)-এর মতো সামাজিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো স্থানীয় পর্যায়ে প্রবীণদের মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিং, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁদের জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। উপসংহার: বার্ধক্য মানবজীবনের এক অনিবার্য ও প্রাকৃতিক সত্য। আজ যিনি তরুণ, আগামী দিনে তিনিই প্রবীণ। তাই প্রবীণদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো কেবল কোনো দয়া বা করুণা নয়, এটি আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে তরুণদের কর্মোদ্দীপনার সাথে যুক্ত করতে পারলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—কোনো প্রবীণ যেন অবহেলা বা একাকীত্বে দিন না কাটান। প্রবীণদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও আনন্দময় পৃথিবী গড়ে তোলাই হোক আমাদের সবার যৌথ প্রয়াস।