যাদব চন্দ্র রায় বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার এক উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি। এই অগ্রযাত্রায় বহুজাতিক বিদেশি কোম্পানিগুলোর (MNCs) ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা বিনিয়োগ আনছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং বিশ্বমানের প্রযুক্তির সাথে আমাদের পরিচয় করাচ্ছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি অত্যন্ত উদ্বেগের। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, এই কোম্পানিগুলো বাংলাদেশকে কেবল একটি ‘বিশাল বাজার’ এবং ‘মুনাফা তৈরির যন্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে। মুনাফার পাহাড় ও দেশের স্বার্থ: ................................................................. বিদেশি কোম্পানিগুলো যখন কোনো দেশে ব্যবসা করে, তখন তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে মুনাফা সর্বোচ্চ করা। এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন সেই মুনাফা অর্জনের প্রক্রিয়াটি স্থানীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ লভ্যাংশ তারা নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাংলাদেশে পুনরায় বিনিয়োগ বা সামাজিক উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণ নগণ্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশকে কেবল মুনাফা কামানোর ক্ষেত্র বা 'Cash Cow' হিসেবে গণ্য করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। পরিবেশ ও স্থানীয় শিল্পের ঝুঁকি: ................................................................. অনেক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে এমন সব পণ্য বা সেবা বিপণন করছে যা আমাদের স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া, শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণের মাধ্যমে আমাদের পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তার দায়ভার এসব কোম্পানি খুব কমই গ্রহণ করে। ব্যবসার নামে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিকের অধিকার ও নৈতিক ব্যবসা: ............................................................................. বাংলাদেশে সস্তা শ্রমের প্রাপ্যতা বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য বড় আকর্ষণ। কিন্তু এই সস্তা শ্রমের সুযোগ নিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করা অনৈতিক। আমাদের জনশক্তিকে কেবল 'সস্তা লেবার' হিসেবে না দেখে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। পরিত্রাণের উপায়: ................................................ ১. নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ: সরকারকে এমন নীতিমালা করতে হবে যেন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ বাংলাদেশে পুনরায় বিনিয়োগ করতে বাধ্য হয়। ২. প্রযুক্তি হস্তান্তর: কেবল পণ্য বিক্রি নয়, বরং প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার শর্ত থাকতে হবে। ৩. স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা: বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তারা যাতে অসম প্রতিযোগিতার শিকার না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। উপসংহার: ..................................... আমরা বিদেশি বিনিয়োগ চাই, তবে তা হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সমতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ কোনো চারণভূমি নয় যে যে কেউ এসে কেবল সুবিধা নিয়ে চলে যাবে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বুঝতে হবে, দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসার জন্য এদেশের মানুষ, প্রকৃতি ও অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন জরুরি। শোষণ নয়, অংশীদারিত্বই হোক ভবিষ্যতের ব্যবসার মূলমন্ত্র।