
নিজস্ব প্রতিবেদক:
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর ফলে বেআইনি গ্রেপ্তার ও মামলা বাণিজ্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। একই সঙ্গে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধ করতেও সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিজয় সরণীর সামরিক জাদুঘর মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ‘সকল নারী ও বালিকার জন্য অধিকার, বিচার ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এই সেমিনারের আয়োজন করে।
আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার জনগণের কল্যাণ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। এ লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২১ দিনের মাথায় জাতীয় পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রায় ৩৭ হাজার ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হয়েছে এবং এসব কার্ডের মালিকানা পরিবারের গৃহকর্ত্রী বা নারী সদস্যের নামে দেওয়া হয়েছে। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১৭টি জনসভায় নারীদের জাগরণের জন্য উদ্বুদ্ধ করার কথাও স্মরণ করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি নীতিগতভাবে একটি নারী কমিশন গঠনের পক্ষে মত দেন।
তবে তিনি বলেন, দেশে একের পর এক কমিশন গঠনের ফলে অনেক সময় দায়িত্বের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিষয়ক একটি অর্ডিন্যান্স জারি হয়েছে, যেখানে গুম কমিশনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গুম কমিশন যুক্ত হওয়ার ফলে মানবাধিকার কমিশনকে গুম সংক্রান্ত তদন্তকাজে বেশি সময় ব্যয় করতে হবে, যার ফলে মানবাধিকার সুরক্ষার মূল কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বিষয়টি নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। তবে সরকারের লক্ষ্য হলো গুমের ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা।
নারী কমিশনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে মৌলবাদীদের লক্ষ্যবস্তুতে অনেক সময় নারীরাই পরিণত হয়। তাই নারীদের সচেতন করে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে নারীদের সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। নারীরা সচেতন হলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।
নারীর অধিকার প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, তার দুই মেয়ে রয়েছে, কিন্তু কোনো ছেলে সন্তান নেই। শরিয়া আইনের বিধান অনুযায়ী তিনি যে সম্পদ অর্জন করবেন, তার সম্পূর্ণ অংশ তার মেয়েরা পাবে না।
তাই এ ক্ষেত্রে বিকল্প আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
বেআইনি গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বেআইনি গ্রেপ্তার বাণিজ্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। মিথ্যা মামলার সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে কমে আসছে। এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা পেলে মিথ্যা মামলার প্রবণতা আরও কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দুর্নীতি প্রতিরোধে নাগরিক সমাজের সহযোগিতা কামনা করে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারের মন্ত্রীরা যাতে তথাকথিত ‘বেগম পাড়া’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, সে বিষয়ে নাগরিক সমাজকে ওয়াচডগ হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, টাইমস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কানাডা, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে ‘বেগম পাড়া’, মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বিভিন্ন রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, যদি বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ করা যায় এবং দেশের অর্থ দেশেই বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা সম্ভব হবে। এতে নারীরা অজ্ঞতা থেকে বের হয়ে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে এবং মৌলবাদের লক্ষ্যবস্তু থেকেও অনেকটাই মুক্ত থাকতে পারবে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামের সঞ্চালনায় আয়োজিত এ সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেঙ্গলি, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. দাউদ মিয়া, বাংলাদেশে জাতিসংঘের নারী প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং, জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক আইরিন খান এবং মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্ট-এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন।
Leave a Reply