স্টাফ রিপোর্টার: ‘নীতি থেকে বাস্তব প্রয়োগ: নৌ খাতে উৎকর্ষতা অর্জন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্ব নৌ দিবস–২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নৌপরিবহন অধিদপ্তর আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশের সামুদ্রিক খাতকে নিরাপদ, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতাসক্ষম করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী পৃথক বাণী প্রদান করেন। বাণীতে বাংলাদেশের সমুদ্র, নদী ও নৌসম্পদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, আধুনিক বন্দরব্যবস্থা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, নৌনিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিধিবিধানের যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল খন্দকার মেসবাহ-উল-আজিম। এছাড়া নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, জাহাজমালিক, শিপিং কোম্পানি, জাহাজ ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, মেরিটাইম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান, নাবিক, সামুদ্রিক পেশাজীবী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, নীতি, পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। শুধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসমর্থন বা আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; নিরাপদ জাহাজ, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক বন্দর, দক্ষ নাবিক, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং টেকসই নৌবাণিজ্যের মাধ্যমে এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বাংলাদেশের বন্দরগুলোর আধুনিকায়ন, অটোমেশন ও সক্ষমতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি পণ্য খালাসের সময় কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শন সক্ষমতা বাড়ানো, ফ্ল্যাগ স্টেট ও পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান কার্যকরভাবে প্রতিপালনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। মন্ত্রী বলেন, দেশের নাবিকরা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সম্পদ এবং বহির্বিশ্বে দেশের প্রতিনিধিত্বকারী জনশক্তি। তাঁদের কল্যাণ, প্রশিক্ষণ, সনদায়ন ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও উপকূলীয় নৌপরিবহনের টেকসই উন্নয়ন, নদীদূষণ প্রতিরোধ এবং নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল খন্দকার মেসবাহ-উল-আজিম তাঁর বক্তব্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সমৃদ্ধির পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বন্দর, নৌবাণিজ্য, মৎস্যসম্পদ, অফশোর সম্পদ ও ব্লু ইকোনমির বিকাশ একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তথ্য বিনিময়, মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। নৌবাহিনী প্রধান বাংলাদেশের নৌ-ঐতিহ্য, দেশীয় নৌযান নির্মাণের দক্ষতা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাবিকদের অবদানের প্রশংসা করেন। মেরিটাইম শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও পেশাগত উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি নারী মেরিটাইম পেশাজীবীদের অংশগ্রহণকে সামুদ্রিক খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী দেশের বন্দর ও নৌপরিবহন খাতের বিভিন্ন অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে বছরে প্রায় ৩৪ লাখ টিইইউ কনটেইনার পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতে প্রায় ৪০ লাখ টিইইউ অতিরিক্ত সক্ষমতার চাহিদা মোকাবিলায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ২০২৯ সালে কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা এ বন্দর প্রায় ২৩০ মিটার দীর্ঘ এবং আট থেকে ১০ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মাদার ভেসেল সরাসরি গ্রহণ করতে পারবে বলে জানান তিনি। এর ফলে পরিবহন সময় ও লজিস্টিক ব্যয় কমার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ নৌপথকে অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সমুদ্রবন্দর, উপকূলীয় নৌপথ ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের মধ্যে কার্যকর সংযোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমন্বিত বহুমুখী পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতির তথ্যও তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর দেশের ২৪টি জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ইয়ার্ড ইতোমধ্যে কমপ্লায়েন্স অর্জন করেছে। আরও ২০টি ইয়ার্ড সনদায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। নিরাপত্তা, শ্রমিককল্যাণ ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করে এ শিল্পকে আধুনিক, দায়িত্বশীল এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতাসক্ষম করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। মহাপরিচালক জানান, তেল ও বাংকার দূষণজনিত ক্ষতিপূরণ এবং জাহাজের ধ্বংসাবশেষ অপসারণসংক্রান্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক কনভেনশনে বাংলাদেশের যোগদান আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা প্রতিপালনে দেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। পাশাপাশি জাতীয় আইন, বিধিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আধুনিকায়নের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার গ্রিনভয়েজ-২০৫০ কর্মসূচির সহায়তায় জাহাজ চলাচল থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে বাংলাদেশ জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কম-কার্বন জ্বালানি ব্যবহার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বন্দর কার্যক্রমের বিদ্যুতায়ন এবং পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সবুজ নৌপরিবহনে উত্তরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। দেশের সামুদ্রিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতের অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, বর্তমানে ১৫টি মেরিটাইম একাডেমি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং একটি মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষ নাবিক, মেরিন প্রকৌশলী ও বন্দর ব্যবস্থাপনা পেশাজীবী তৈরিতে কাজ করছে। ২০১৪ সাল থেকে ১৩৮ জনের বেশি নারী ক্যাডেট দেশের মেরিটাইম একাডেমিগুলো থেকে উত্তীর্ণ হয়েছেন। বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ৫০ জন নারী ক্যাডেট প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করছেন বলেও অনুষ্ঠানে জানানো হয়। সামুদ্রিক দুর্ঘটনায় দ্রুত সাড়া প্রদান, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম, জাহাজ শনাক্তকরণ এবং সমন্বিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের জয়েন্ট রেসকিউ অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌযানগুলোকে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল নিবন্ধন ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগও তুলে ধরা হয়। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, সরকার, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, জাহাজমালিক, শিপিং কোম্পানি, জাহাজ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকারী, মেরিটাইম একাডেমি, নাবিক এবং অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে রূপান্তর করা সম্ভব। বিশ্ব নৌ দিবস–২০২৬-এর মূল আহ্বান হিসেবে অনুষ্ঠানে বলা হয়, নীতিকে কার্যক্রমে রূপান্তর করতে হবে, অঙ্গীকারকে পরিণত করতে হবে পরিমাপযোগ্য অর্জনে এবং সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে দৃশ্যমান জাতীয় সুফলে রূপ দিতে হবে। নিরাপদ, সবুজ, স্মার্ট, সুরক্ষিত ও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতাসক্ষম সামুদ্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।