
: — যাদব চন্দ্র রায় ‘ভলান্টিয়ার’ বা ‘স্বেচ্ছাসেবক’ শব্দটির সাথে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। অনেকে মনে করতে পারেন, আজকের এই চরম ব্যক্তিকেন্দ্রীক ও পুঁজিবাদী সমাজে যেখানে মানুষ নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত, সেখানে বিনা পয়সায় অন্যের জন্য শ্রম দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা আছে কি? সমাজ কি আদৌ স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর নির্ভর করে? একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি— হ্যাঁ, একটি সুস্থ, মানবিক এবং প্রগতিশীল সমাজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে স্বেচ্ছাসেবকদের অবদান অপরিসীম এবং অপরিহার্য। স্বেচ্ছাসেবা কোনো দয়া বা দাক্ষিণ্য নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতার এক সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। যেকোনো দুর্যোগে, তা মহামারী হোক কিংবা বন্যা-খরা, সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের আগে সমাজের সাধারণ স্বেচ্ছাসেবকরাই সবার আগে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানুষের দুয়ারে খাবার, ওষুধ ও সান্ত্বনা পৌঁছে দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর যে সীমাবদ্ধতা থাকে, স্বেচ্ছাসেবকদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা সেই শূন্যতা পূরণ করে। শুধু দুর্যোগেই নয়, একটি সমাজের কাঠামোগত ও মানসিক উন্নয়নেও এদের ভূমিকা অনন্য। রক্তদান কর্মসূচি, পথশিশুদের শিক্ষাদান, পরিবেশ রক্ষা, বৃক্ষরোপণ কিংবা প্রবীণদের সেবা— প্রতিটা ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছাসেবকরা সমাজের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্র বা প্রশাসন একা কখনো একটি দেশের সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সেখানেই প্রয়োজন হয় এমন কিছু তরতাজা ও সংবেদনশীল প্রাণের, যারা কোনো ব্যক্তিগত লাভের আশা না করে কেবল মানুষের কল্যাণে নিজেদের সময় ও শ্রম বিলিয়ে দেয়। বর্তমান যুগে তরুণ সমাজ যখন নানা ধরণের অবক্ষয়, একাকীত্ব ও গ্যাজেট আসক্তিতে ভুগছে, তখন স্বেচ্ছাসেবা তাদের আলোর পথ দেখায়। এটি যুবসমাজকে সহমর্মিতা, নেতৃত্বগুণ, দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা এবং দায়িত্বশীলতা শেখায়। যে তরুণ আজ অন্য একজন বিপন্ন মানুষের জন্য নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে ছুটে যাচ্ছে, সে কখনো সমাজবিরোধী বা দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ হতে পারে না। পরিশেষে বলতে চাই, সমাজ থেকে যদি স্বেচ্ছাসেবার মানসিকতা হারিয়ে যায়, তবে সমাজটি একটি যান্ত্রিক ও নিষ্প্রাণ পাথরে পরিণত হবে। আইন দিয়ে মানুষকে বাধ্য করা যায়, কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে সমাজকে বদলে দেওয়ার কাজটি কেবল স্বেচ্ছাসেবকরাই করতে পারে। তাই সমাজ গঠনে তাদের প্রয়োজনীয়তা অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আসুন, আমরা নিজে এবং আমাদের সন্তানদের এই মহৎ কাজের সাথে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করি।
Leave a Reply