
: ………………………………………………………………………………………………….. যাদব চন্দ্র রায়.…………………….. বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় এক সংস্কৃতির দেশ। আবহমানকাল থেকে এ দেশের সমতল ও পাহাড়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করে আসছে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও মৈত্রীর বন্ধনে আদিবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যুগের পর যুগ ধরে এই মানুষগুলো একটি মৌলিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে—তা হলো তাদের পৈত্রিক জমি থেকে উচ্ছেদ। প্রতিনিয়ত ভূমিগ্রাসীদের লোভের থাবায় আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব জমি, ভিটেমাটি এবং বনাঞ্চল হারাচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু তাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করছে না, বরং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে। তাই আদিবাসীদের পৈত্রিক জমি থেকে উচ্ছেদ বন্ধে এখনই রাষ্ট্রকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। ঐতিহাসিকভাবেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি ও জীবিকা আবর্তিত হয় জমি ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে। সমতলের আদিবাসীদের একটা বড় অংশের নিজস্ব ভূমির কোনো সুনির্দিষ্ট দলিল বা রেকর্ড নেই। তারা মূলত প্রথাগত অধিকার (Customary Rights) ও বংশপরম্পরায় এই ভূমি ভোগদখল করে আসছে। ভূমির এই আইনি জটিলতা বা অসচেতনতার সুযোগ নেয় একশ্রেণীর প্রভাবশালী ও ভূমিগ্রাসী মহল। জালিয়াতি, ভুয়া দলিল তৈরি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদের মাধ্যমে আদিবাসীদের পৈত্রিক সম্পত্তি দখল করা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নিজ ভূমিতে পরবাসী হয়ে বহু আদিবাসী পরিবার আজ চরম দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আমাদের সংবিধানে সব নাগরিকের সমঅধিকার, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং সম্পত্তির অধিকারের কথা স্পষ্ট বলা আছে। তদুপরি, বিশেষত সমতলের আদিবাসীদের জন্য ‘স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট, ১৯৫০’ (State Acquisition and Tenancy Act, 1950)-এর ৯৭ ধারা অনুযায়ী, সরকারের অনুমতি ছাড়া আদিবাসীদের জমি অ-আদিবাসীদের কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই চমৎকার আইনি সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে এর প্রয়োগ খুবই দুর্বল। আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে অথবা স্থানীয় প্রশাসনের একাংশের উদাসীনতায় এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আদিবাসীদের জমি বেদখল করা হচ্ছে। পৈত্রিক জমি থেকে উচ্ছেদ বন্ধ করতে হলে কেবল আইন থাকলেই চলবে না, তার কঠোর ও আপসহীন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, আদিবাসীদের ভূমির মালিকানা সুরক্ষায় একটি স্বাধীন ও কার্যকর ‘ভূমি কমিশন’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সমতলের আদিবাসীদের জন্যও বিশেষ ভূমি কমিশন গঠন করে বিরোধপূর্ণ জমিগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যারা জালিয়াতি বা বলপ্রয়োগ করে আদিবাসীদের জমি দখল করছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় আরও সংবেদনশীল ও তৎপর হতে হবে। কোনো আদিবাসী পরিবার যেন উচ্ছেদের হুমকির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। চতুর্থত, আদিবাসীদের আইনি সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা (Legal Aid) দেওয়ার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। উন্নয়ন কখনো কাউকে বাদ দিয়ে হতে পারে না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের প্রধান শর্তই হলো—’কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না’। আদিবাসী সম্প্রদায়কে পেছনে ফেলে, তাদের ভূমিহীন ও গৃহহীন করে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তারা এই মাটির সন্তান, এই দেশের নাগরিক। তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটি রক্ষা করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। আমরা আশা করি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমতলের আদিবাসীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং পৈত্রিক জমি থেকে উচ্ছেদ বন্ধে অবিলম্বে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। লেখক: নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি), দিনাজপুর।
Leave a Reply