
যাদব চন্দ্র রায়
নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর
১. ভূমিকা:
একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই দেশের শিশুদের সঠিক বিকাশের ওপর। শিশুর মস্তিষ্কের প্রায় ৯০ ভাগ বিকাশ ঘটে তার প্রাথমিক শৈশবে। তাই তাদের জন্য একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন এবং সুরক্ষামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নয়, বরং আমাদের নৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকার। বর্তমান বাংলাদেশে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি হলেও তৃণমূল পর্যায়ে শিশুদের সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনও নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও গ্রামীণ শিশুদের অধিকার রক্ষায় মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে এই ধারণাচিত্রটি তৈরি করা হয়েছে।
২. শিশু সুরক্ষা কী?
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, শিশু সুরক্ষা বলতে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, শোষণ, অবহেলা এবং সমস্ত ক্ষতিকর সামাজিক প্রথা থেকে রক্ষা করার জন্য গৃহীত সমন্বিত পদক্ষেপ ও নীতিমালার সমষ্টিকে বোঝায়। এর মূল লক্ষ্য হলো—সহিংসতা ও অপব্যবহার থেকে শিশুদের মুক্ত রেখে তাদের সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা।
৩. বাংলাদেশের বর্তমান শিশু সুরক্ষা পরিস্থিতি ও প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষায় চমৎকার কিছু আইন ও নীতিমালা (যেমন: শিশু আইন ২০১৩, জাতীয় শিশু নীতি ২০১১) থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু দৃশ্যমান ঘাটতি রয়েছে:
পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা: করোনাকালীন সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পারিবারিক অশান্তি ও অসচেতনতার কারণে শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অনলাইন ও সাইবার ঝুঁকি: ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারের ফলে শিশুরা সাইবার বুলিং, পর্নোগ্রাফি এবং অনলাইন গ্রুমিংয়ের মতো মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
প্রান্তিক ও আদিবাসী শিশুদের অধিকার: দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বসবাসরত সমতলের আদিবাসী ও চরম দরিদ্র পরিবারের শিশুরা পুষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হচ্ছে।
বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রম: অর্থনৈতিক সংকট ও সচেতনতার অভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও বাল্যবিয়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের হার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা: শিশুদের পড়াশোনার চাপ ও সামাজিক প্রতিযোগিতার কারণে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা প্রতিরোধে আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
৪. উত্তরণের উপায় ও প্রস্তাবিত সুপারিশমালা:
তৃণমূল পর্যায়ে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশে একটি টেকসই শিশু সুরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
[শিশু সুরক্ষা মডেল]
├── ১. তৃণমূল ওয়ার্ড পর্যায় ──> শিশু সুরক্ষা কমিটি (পাড়াভিত্তিক মনিটরিং)
├── ২. প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় ──> বিদ্যালয়ে ‘কাউন্সেলিং ও কমপ্লেইন বক্স’ স্থাপন
└── ৩. আইনি ও সামাজিক পর্যায় ──> ১০৯৮ হেল্পলাইন প্রচার ও দ্রুত আইনি সহায়তা
স্থানীয় সরকারের সক্রিয়তা বৃদ্ধি: ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে গঠিত ‘শিশু সুরক্ষা কমিটি’ সমূহকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এই কমিটিগুলো নিয়মিত পাড়াভিত্তিক মনিটরিং নিশ্চিত করবে।
বিদ্যালয়-ভিত্তিক সচেতনতা: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের মানসিক সুরক্ষায় একজন কাউন্সিলর বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক থাকা আবশ্যক। শিশুরা যেন তাদের যেকোনো সমস্যার কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারে, সেজন্য বিদ্যালয়গুলোতে ‘অভিযোগ বক্স’ স্থাপন করা প্রয়োজন।
ডিজিটাল লিটারেসি বা তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা: পাঠ্যপুস্তকে এবং পারিবারিক শিক্ষায় নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়মাবলী (Cyber Safety) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শিশুরা অনলাইন ফাঁদ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।
সরকারি-বেসরকারি (NGO) সমন্বয়: সরকারি শিশু সুরক্ষা সেবা (যেমন: ১০৯৮ হেল্পলাইন) এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরত এনজিওগুলোর মধ্যে কাজের সমন্বয় বাড়াতে হবে, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো ভুক্তভোগী শিশুকে উদ্ধার ও আইনি সহায়তা দেওয়া যায়।
আইনের কঠোর প্রয়োগ: শিশু নির্যাতনকারী এবং বাল্যবিয়ের আয়োজকদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা সামাজিক ছাড় না দিয়ে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. উপসংহার:
সবশেষে বলা যায়, শিশু সুরক্ষা কেবল একটি আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা প্রতিটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রে শিশুদের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ নিশ্চিত করতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আসুন, দল-মত নির্বিশেষে আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে শিশুর জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে একযোগে কাজ করি।
Leave a Reply