
বিশ্ব শিক্ষক দিবস: গুণগত শিক্ষার চালিকাশক্তি এবং শিক্ষকের ভূমিকা প্রবন্ধকার: যাদব চন্দ্র রায়…………………….. নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর ও সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা ট্রাস্ট (BJSST), দিনাজপুর জেলা শাখা মোবাইল: ০১৭১৬৮৭৮৮৪৪, ই-মেইল: cdcdinajpur@yahoo.com ভূমিকা: “শিক্ষাই জগতকে আলোড়িত করে, আর শিক্ষক সেই আলোর মশালবাহক।” একটি জাতি কতটা উন্নত এবং প্রগতিশীল, তা নির্ভর করে সেই জাতির শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। আর যেকোনো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হলেন শিক্ষক। মানবসম্পদ উন্নয়ন, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং একটি সাম্যবাদী ও প্রজ্ঞাবান সমাজ গঠনে শিক্ষকের অবদান অনস্বীকার্য। প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। শিক্ষকদের অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দিতে, তাদের অধিকার সুরক্ষা করতে এবং সমাজ গঠনে তাদের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখার প্রত্যয়ে এই দিবসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের পটভূমি: ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেস্কো (UNESCO) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) একটি বিশেষ আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্মেলনে শিক্ষকদের স্থিতি বা মর্যাদা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ‘সুপারিশমালা’ (Recommendation concerning the Status of Teachers) গৃহীত হয়। এতে শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব এবং কর্মসংস্থানের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে, ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ড. ফেদেরিকো মেয়রের ঘোষণায় ৫ অক্টোবরকে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেই থেকে বিশ্বব্যাপী শিক্ষকদের সম্মান ও অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে এই দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে। শিক্ষা ও সমাজ গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা: শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণকারী নন; তিনি একজন মেন্টর, পথপ্রদর্শক এবং সমাজ সংস্কারক। জ্ঞান ও মেধার বিকাশ: সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করে শিক্ষার্থীদের আগামী দিনের দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার মূল দায়িত্ব শিক্ষকের। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা: সমাজে সততা, পরোপকার, দেশপ্রেম এবং মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটে শিক্ষকের হাত ধরেই। সামাজিক রূপান্তর: কুসংস্কার, অজ্ঞতা এবং অন্ধত্ব দূর করে একটি প্রগতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনে শিক্ষকেরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। টেকসই উন্নয়ন ও গুণগত শিক্ষা: জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-4)-এ গুণগত শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। এই গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রধান শর্তই হলো দক্ষ, যোগ্য এবং অনুপ্রাণিত শিক্ষক। উপযুক্ত পরিবেশ ও আধুনিক প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষকেরা তাদের সেরাটা দিতে পারেন না। তাই শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিবান্ধব শিক্ষাদানে দক্ষ করে তোলা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শিক্ষকদের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও মর্যাদা: বর্তমান যুগে শিক্ষকেরা নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা এখনো অনেক ক্ষেত্রে আশানুরূপ নয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রশাসনিক অবহেলা লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষকতা যদি কেবল একটি সাধারণ পেশা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং শিক্ষকেরা যদি অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে নিরাপদ বোধ না করেন, তবে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে অনীহা প্রকাশ করবে। যা সামগ্রিকভাবে একটি জাতির মেধা শূন্যতার কারণ হতে পারে। আমাদের করণীয়: শিক্ষকদের যথাযোগ্য মর্যাদা নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্রের নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দায়িত্ব। ১. শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক বেতন কাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ২. আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য শিক্ষকদের নিয়মিত মানসম্মত ও আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। ৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে মেধার মূল্যায়ন করতে হবে। ৪. শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। উপসংহার: শিক্ষকেরা হলেন একটি জাতির আলোকবর্তিকা। তাদের হাত ধরেই বিনির্মিত হয় দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং শিক্ষকদের অধিকার রক্ষা, পেশাগত উন্নয়ন এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকলেই একটি শিক্ষিত, সমৃদ্ধ এবং মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
Leave a Reply