
প্রবন্ধ: জাতীয় কন্যাশিশু দিবস ও আমাদের করণীয়:……. প্রবন্ধক: যাদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর এবং সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (BJSS), দিনাজপুর জেলা কমিটি যোগাযোগ: মোবাইল: ০১৭১৬৮৭৮৮৪৪, ই-মেইল: cdcdinajpur@yahoo.com ভূমিকা: “আজকের কন্যাশিশু, আগামী দিনের মা। তদুপরি সে এই দেশের একজন নাগরিক এবং আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পদ”। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে অর্ধেক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ নারীসমাজকে বাদ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যেই প্রতিবছর বাংলাদেশে ৩০ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালন করা হয়। দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কন্যাশিশুরা কোনো দায় বা বোঝা নয়, বরং সঠিক সুযোগ-সুবিধা পেলে তারা দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত হতে পারে। দিবসের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব: কন্যাশিশুদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, বাল্যবিয়ে রোধ, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষার আলো সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সাল থেকে এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বরকে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়। কন্যাশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। বর্তমান পরিস্থিতি: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ: বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে কন্যাশিশুদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের শতভাগ ভর্তি এবং জেন্ডার সমতা অর্জনে বাংলাদেশ অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক স্তরে পদার্পণ করলেই চিত্রটি পাল্টে যায়। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য ও পরিসংখ্যান (BANBEIS) অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রদের ঝরে পড়ার হার যেখানে ৩০.৬৩%, সেখানে ছাত্রীদের বা কন্যাশিশুদের ঝরে পড়ার হার প্রায় ৩৪.৮৭%। এই ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে: বাল্যবিয়ে: গ্রামীণ ও অসচেতন পরিবারগুলোতে এখনও মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেওয়ার মানসিকতা রয়ে গেছে। নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক কুসংস্কার: ইভটিজিং, সাইবার ক্রাইম এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব কন্যাশিশুদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের অবহেলা: অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক পরিবারে কন্যাশিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। কন্যাশিশুদের সুরক্ষায় সরকারের পদক্ষেপ: বাংলাদেশ সরকার কন্যাশিশুদের সার্বিক উন্নয়নে নানামুখী ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারী শিক্ষার প্রসার ও বাল্যবিয়ে রোধে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান এবং নারীদের জন্য বিশেষ কোটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইনি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। তবে সরকারের এই উদ্যোগগুলোকে মাঠপর্যায়ে সফল করতে হলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO), সুশীল সমাজ ও সাংবাদিকদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। আমাদের করণীয়: একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণে: কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC)-এর মতো উন্নয়ন সংস্থা এবং সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করা。 কন্যাশিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে নিচের বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া জরুরি: ১. বাল্যবিয়েকে ‘না’ বলা: যেকোনো মূল্যে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে এবং অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে যে, মেয়েদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করাই তাদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। ২. মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি: শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি নয়, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত কন্যাশিশুদের পড়াশোনা টিকিয়ে রাখার জন্য স্থানীয়ভাবে তদারকি বাড়াতে হবে। কারিগরি ও আইসিটি শিক্ষায় তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। ৩. সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিতকরণ: রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে কন্যাশিশুদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের যেকোনো সমস্যায় আইনি ও মানসিক সহায়তা প্রদানে সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। ৪. বৈষম্যহীন পারিবারিক পরিবেশ: পরিবার থেকেই ছেলে ও মেয়ের মধ্যকার মানসিক ভেদাভেদ দূর করতে হবে। পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কন্যাশিশুকে সমান অধিকার দিতে হবে। উপসংহার: কন্যাশিশুদের স্বপ্ন দেখার অধিকার এবং সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ আমাদেরই তৈরি করে দিতে হবে। আজকের কন্যাশিশু যদি অবহেলিত থাকে, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারবে না। তাই আসুন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আমরা স্থানীয় পর্যায় থেকে, আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা ও সুরক্ষায় একাত্ম হয়ে কাজ করি। জাতীয় কন্যাশিশু দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—”একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ হোক প্রতিটি কন্যাশিশুর।”
Leave a Reply