
যাদব চন্দ্র রায়…………………………
ভূমিকা:
“মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থতা ও কল্যাণের ভিত্তি”—এই চিরন্তন সত্যকে সামনে রেখে প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। শারীরিক সুস্থতার মতোই মানসিক সুস্থতা মানবজীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আধুনিক সমাজব্যবস্থায় আমরা শারীরিক অসুস্থতাকে যতটা গুরুত্ব দিই, মানসিক স্বাস্থ্যকে ততটাই অবহেলা করি। এই অবহেলা দূর করে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
মানসিক স্বাস্থ্য কী এবং এর গুরুত্ব:
মানসিক স্বাস্থ্য কেবল কোনো মানসিক ব্যাধি বা উন্মাদনার অনুপস্থিতি নয়; বরং এটি হলো মানুষের চিন্তা, অনুভূতি এবং আচরণের এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার নিজস্ব সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারে, জীবনের স্বাভাবিক চাপ বা ধকল মোকাবিলা করতে পারে, ফলপ্রসূভাবে কাজ করতে পারে এবং সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে।
সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য মানসিক সুস্থতা অপরিহার্য। মন ভালো না থাকলে শরীরও ভালো থাকে না। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কে ফাটল ধরায়। তাই একটি সুস্থ জাতি গঠনে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ:
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে মানসিক স্বাস্থ্য খাতটি চরমভাবে উপেক্ষিত। আমাদের সমাজে মানসিক সমস্যাকে এখনো একটি সামাজিক কলঙ্ক বা ‘ট্যাবু’ (Stigma) হিসেবে দেখা হয়। কেউ মানসিক সমস্যায় ভুগলে তাকে ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করা হয় বা কবিরাজি, ঝাড়ফুঁকের মতো কুসংস্কারের আশ্রয় নেওয়া হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি লোকলজ্জার ভয়ে নিজের সমস্যা লুকিয়ে রাখেন এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিতে পারেন না।
এছাড়াও আমাদের দেশে দক্ষ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাকেন্দ্রের তীব্র অভাব রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বঞ্চিত। ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তির অপব্যবহার, বেকারত্ব, পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা ও কমিউনিটি সেন্টারের ভূমিকা:
মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল মানুষের কাছে নিয়ে যেতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (NGOs) ভূমিকা অনস্বীকার্য। দিনাজপুর জেলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC)-এর মতো স্থানীয় সংস্থাগুলো প্রান্তিক মানুষের অধিকার, স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তৃণমূল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব ছড়িয়ে দিতে এবং কুসংস্কার দূর করতে গ্রামীণ কমিউনিটিগুলোকে সচেতন করা প্রয়োজন। একই সাথে, সমাজের দর্পণ হিসেবে সাংবাদিক সমাজ এবং বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা ট্রাস্ট (BJSST)-এর মতো সাংবাদিক সংগঠনগুলো তাদের ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
আমাদের করণীয়:
মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সবারই সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন:
সচেতনতা বৃদ্ধি: মানসিক রোগ যে অন্য আট-দশটা শারীরিক রোগের মতোই নিরাময়যোগ্য, এই বার্তাটি সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
সহমর্মিতার পরিবেশ: পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে যে কেউ দ্বিধাহীনভাবে তার মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করতে পারে।
প্রাথমিক কাউন্সিলিং: প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে কাউন্সিলর বা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়ক কর্মীর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
চিকিৎসা সেবার সহজলভ্যতা: উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট চালু করতে হবে এবং ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার:
মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল চেতনা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা মানসিক রোগীকে অবহেলা না করে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেব। আসুন, আমরা নিজে সচেতন হই, অন্যকে সচেতন করি এবং একটি মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ, সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি।
প্রবন্ধক:
যাদব চন্দ্র রায়
নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর
ও
সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা ট্রাস্ট (BJSST), দিনাজপুর জেলা শাখা
মোবাইল: ০১৭১৬৮৭৮৮৪৪, ই-মেইল: cdcdinajpur@yahoo.com
Leave a Reply