
বিশ্ব দৃষ্টি দিবস ২০২৬: অন্ধত্ব প্রতিরোধ ও সবার জন্য মানসম্মত চক্ষুসেবা………………………………
প্রবন্ধক:
যাদব চন্দ্র রায়
নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর
ও সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা ট্রাস্ট (BJSST), দিনাজপুর জেলা শাখা
মোবাইল: ০১৭১৬৮৭৮৮৪৪, ই-মেইল: cdcdinajpur@yahoo.com
ভূমিকা:
দৃষ্টি মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয়ের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। চোখ ছাড়া আমাদের চারপাশের এই সুন্দর পৃথিবী অন্ধকার। অথচ সচেতনতার অভাব এবং যথাসময়ে উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছেন বা দৃষ্টি ত্রুটি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব দৃষ্টি দিবস। এ বছর ৮ অক্টোবর ২০২৬ বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দিবসটি পালিত হয়েছে।
প্রতিপাদ্য ও মূল চেতনা:
আন্তর্জাতিক অন্ধত্ব প্রতিরোধ সংস্থা (IAPB)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, বিশ্ব দৃষ্টি দিবস ২০২৬-এর বৈশ্বিক মূল প্রচারণামূলক স্লোগান হলো “Love Your Eyes” (আপনার চোখকে ভালোবাসুন)। একই সাথে এ বছর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে— “এটি কেবল দৃষ্টি নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ” (It’s not just sight. It’s an entire future)। এই প্রতিপাদ্যের মূল উদ্দেশ্য হলো— চোখের যত্ন নেওয়াকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক অভ্যাসে পরিণত করা এবং সবার জন্য মানসম্মত, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী চক্ষুসেবা নিশ্চিত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও চোখের রোগসমূহ:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের শতকোটিরও বেশি মানুষ প্রয়োজনীয় চক্ষুসেবা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশেও অন্ধত্ব এবং দৃষ্টিশক্তির স্বল্পতা একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। আমাদের দেশে অন্ধত্বের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. ছানি (Cataract): বয়স্ক মানুষের অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ এটি, যা সহজ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব।
২. ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি (Diabetic Retinopathy): বর্তমান সময়ে ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃদ্ধির কারণে রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
৩. গ্লুকোমা ও প্রতিসরণজনিত ত্রুটি: চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ বৃদ্ধির কারণে গ্লুকোমা এবং শিশুদের ক্ষেত্রে চালিশা বা ক্ষীণদৃষ্টির মতো সমস্যাগুলো সময়মতো চিহ্নিত না হলে স্থায়ী অন্ধত্ব ডেকে আনে।
৪. অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম: বর্তমান প্রযুক্তির যুগে কম্পিউটার, মোবাইল ও ট্যাবলেটের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে শিশু ও তরুণদের চোখের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
অন্ধত্ব প্রতিরোধে আমাদের করণীয়:
১. নিয়মিত চোখ পরীক্ষা: কোনো সমস্যা না থাকলেও বছরে অন্তত একবার অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত।
২. সুষম খাদ্য গ্রহণ: চোখের দৃষ্টি ভালো রাখতে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: ছোট মাছ, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, সবুজ শাকসবজি) নিয়মিত খাওয়া প্রয়োজন।
৩. সচেতনতা বৃদ্ধি: প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের কাছে চোখের প্রাথমিক যত্ন ও চিকিৎসার বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।
৪. প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থেকে প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকানোর অভ্যাস (20-20-20 নিয়ম) গড়ে তুলতে হবে।
কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC) ও গণমাধ্যমের ভূমিকা:
দিনাজপুরসহ দেশের উত্তর ও প্রান্তিক অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC) দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক চক্ষু স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, বিনামূল্যে চক্ষু ক্যাম্প পরিচালনা এবং অন্ধত্ব দূরীকরণে স্থানীয় পর্যায় থেকে সচেতনতা তৈরি করা সিডিসির অন্যতম লক্ষ্য।
একই সাথে, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা ট্রাস্ট (BJSST)
-এর মতো গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সামাজিক সংগঠনগুলো জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা পালন করতে পারে। লেখনী ও প্রচারণার মাধ্যমে চোখের বিভিন্ন রোগ এবং তার প্রতিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাসেবার সুযোগগুলো তুলে ধরা গণমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্ব।
উপসংহার:
একটি দৃষ্টি ত্রুটিমুক্ত এবং সুস্থ সমাজ গঠনে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO) ও গণমাধ্যম যদি একসাথে কাজ করে, তবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের জন্য মানসম্মত চক্ষুসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশ্ব দৃষ্টি দিবস ২০২৬-এর এই ক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক— আমরা নিজের চোখের যত্ন নেব, অন্যকে সচেতন করব এবং দেশের সকল নাগরিকের জন্য অন্ধত্বমুক্ত এক সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে অবদান রাখব।
Leave a Reply