
পরিবেশ আইন: নাগরিক ও প্রকৃতির সুরক্ষাকবচ (বিশেষ প্রেক্ষাপট: দিনাজপুরের পরিবেশগত সংকট ও উত্তরণ) প্রবন্ধক: যাদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি), দিনাজপুর এবং সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (বিজেএসএস), দিনাজপুর জেলা শাখা মোবাইল: ০১৭১৬৮৭৮৮৪৪, ই-মেইল: cdcdinajpur@yahoo.com ভূমিকা মানুষ ও প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু আধুনিক নগরকেন্দ্রিক উন্নয়ন, অপরিকল্পিত কৃষি এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত আচরণের কারণে আজ বিশ্বজুড়ে পরিবেশ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জেলা দিনাজপুর আজ নানাবিধ পরিবেশগত সংকটে জর্জরিত। এই পরিস্থিতিতে নাগরিক জীবন ও বিপন্ন প্রকৃতিকে রক্ষা করতে আইনি কাঠামোর ভূমিকা অপরিসীম। পরিবেশ আইন হলো এমন এক সুরক্ষাকবচ, যা মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। নাগরিক সুরক্ষায় পরিবেশ আইন: দিনাজপুর প্রেক্ষাপট পরিবেশ আইন সরাসরি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং মৌলিক অধিকারের সুরক্ষার সাথে জড়িত। এটি নাগরিকদের নিম্নোক্ত উপায়ে সুরক্ষা প্রদান করে: ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা ও নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা: বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দিনাজপুরে প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে (ফাল্গুন থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস) ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যায়। অতিরিক্ত গভীর নলকূপ (Deep Tubewell) দিয়ে পানি তোলার কারণে সাধারণ নাগরিকদের অগভীর নলকূপগুলোতে পানি পাওয়া যায় না। ‘বাংলাদেশ পানি আইন (২০১৩)’ অনুযায়ী পানির উৎসের সুষম ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতি-উত্তোলন রোধে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই আইনের সঠিক প্রয়োগই কেবল দিনাজপুরের নাগরিকদের তীব্র সুপেয় পানির সংকট থেকে বাঁচাতে পারে। স্বাস্থ্য ও জীবনের অধিকার রক্ষা: সংবিধানে বর্ণিত মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের অন্যতম শর্ত হলো দূষণমুক্ত পরিবেশ। ফসলি জমিতে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার দিনাজপুরের গ্রামীণ জনপদে অগভীর নলকূপের পানিতে প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিবেশ আইন এই ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিকের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে নাগরিকদের খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করে। ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তি: ‘পরিবেশ আদালত আইন (২০১০)’-এর অধীনে পরিবেশ আদালতের মাধ্যমে ভুক্তভোগী সাধারণ নাগরিকরা দূষণকারী ব্যক্তি বা কোনো ক্ষতিকর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করতে পারেন এবং পরিবেশগত ক্ষতির জন্য উপযুক্ত প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেন। প্রকৃতির সুরক্ষায় পরিবেশ আইন: বিপন্ন দিনাজপুর প্রকৃতি নিজে মুখে কথা বলতে পারে না, তাই তার অধিকার রক্ষায় আইনকে ঢাল হিসেবে দাঁড়াতে হয়। দিনাজপুরের স্থানীয় প্রকৃতির সুরক্ষায় পরিবেশ আইনের ভূমিকা নিম্নরূপ: দিনাজপুরের নদ-নদী ও ঘাগড়া ক্যানেল পুনরুজ্জীবন: দিনাজপুরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া পুনর্ভবা, ঢেপা এবং আত্রাই নদী আজ দখল, দূষণ এবং বালু উত্তোলনের কারণে মৃতপ্রায়। বিশেষ করে শহরের ঐতিহাসিক ঘাগড়া ক্যানেলটি আজ অবৈধ দখল আর শহরের বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে, যা বর্ষায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে。 ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (১৯৯৫)’ এবং মহামান্য হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী নদী ও জলাশয় দখল সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে দিনাজপুরের নদীগুলোর নাব্যতা এবং জলজ বাস্তুসংস্থান (Ecosystem) ফিরিয়ে আনতে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও মরুকরণ রোধ: অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের এই জেলাটিতে খরা ও তীব্র শীতের মতো চরম আবহাওয়ার প্রকোপ বাড়ছে。 পরিবেশ আইন অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বনায়ন বৃদ্ধি এবং সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা দিনাজপুরের মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং মরুকরণ প্রক্রিয়া রোধে অত্যন্ত জরুরি। আইনের প্রয়োগ: সাংবাদিক সমাজ ও সিডিসির ভূমিকা বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষায় শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও কেবল যথাযথ প্রয়োগের অভাবে দিনাজপুরের মতো জেলাগুলো আজ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। আইনকে কার্যকর করতে মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী তদারকি প্রয়োজন। এই জায়গাতেই কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি)-এর মতো উন্নয়ন সংস্থা এবং বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (বিজেএসএস)-এর মতো সচেতন গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। সাংবাদিক সমাজ যখন নদী দখল ও পানি সংকটের সত্যচিত্র তুলে ধরে এবং সিডিসি যখন তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করে, তখনই স্থানীয় প্রশাসন পরিবেশ আইন বাস্তবায়নে বাধ্য হয়। উপসংহার পরিবেশের সুরক্ষা কেবল কোনো একক ব্যক্তি বা সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। দিনাজপুরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা এবং পুনর্ভবা-ঢেপা নদীসহ ঘাগড়া ক্যানেলকে বাঁচানো আজ সময়ের দাবি। “প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে”—এই চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে পরিবেশ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি এবং সর্বস্তরে গণসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই কেবল আমরা দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী সবুজ ও সুন্দর পরিবেশকে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ রেখে যেতে পারি। Note:Jadab Chandra Roy,President of the Save the River Movement Bangladesh,Dinajpur District Committee.
Leave a Reply