
বিশ্ব আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু দিবস ২০২৬: অধিকার, সহনশীলতা ও সমতলের প্রান্তিক আখ্যান যাদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর . আজ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। বিশ্বমানবতার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছরই পৃথিবীর বুকে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে উদযাপিত হচ্ছে “বিশ্ব আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের আন্তর্জাতিক দিবস”। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এবারের দিবসের মূল বার্তা—“Indigenous women and girls: Rights, resilience and leadership” অর্থাৎ আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু: অধিকার, সহনশীলতা ও নেতৃত্ব। এই প্রতিপাদ্য কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এটি সমতলের প্রান্তিক জনপদে বসবাসকারী লাখ লাখ আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর জীবনসংগ্রাম, তাঁদের টিকে থাকার অদম্য শক্তি এবং অধিকার আদায়ের এক দীপ্ত ইশতেহার। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, “বিশ্বে প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ আদিবাসী নারী রয়েছেন।” যারা ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা এবং ঐতিহ্য ধারণ করে বিশ্বসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করছেন। তবে, আমাদের উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরসহ সমতলের প্রান্তিক বাস্তবতায় এই নারীদের জীবন চিত্রটি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। যুগ যুগ ধরে সমতলের আদিবাসী নারীরা জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট, এবং নানামুখী সামাজিক বৈষম্যের মুখেও পরিবার, সমাজ এবং কৃষিকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাঁরা একাধারে গৃহের চালিকাশক্তি, অন্যদিকে মাঠের কঠোর পরিশ্রমী রূপকার। অথচ, তাঁদের এই অবদান প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এবং সামাজিকভাবে মূল্যায়িত হয় না বললেই চলে। একটি অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আমাদের নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর অনতিবিলম্বে জোর দেওয়া প্রয়োজন: ভূমি অধিকার ও সমতলের আদিবাসী নারী: সমতলের আদিবাসীদের জীবনের প্রধান সংকট হলো ভূমির অনিরাপত্তা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং আইনি জটিলতার কারণে আদিবাসী নারীরা ভূমির ওপর তাঁদের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ হারান। আমাদের দাবি, সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের ভূমির ওপর যৌথ ও ব্যক্তিগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সহিংসতা প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচার: সাম্প্রতিক মানবাধিকার প্রতিবেদনগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন এবং নানা বৈষম্যমূলক সহিংসতা প্রতিনিয়ত ঘটছে। তাঁদের জন্য বিশেষায়িত আইনি সহায়তা, দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। কন্যাশিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা: দিনাজপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু আদিবাসী কন্যাশিশু ভাষাভিত্তিক প্রতিবন্ধকতা এবং চরম অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের কারণে প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি পার হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। তাদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগসহ পুষ্টি ও বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নেতৃত্বের বিকাশ (Leadership): আদিবাসী নারীরা কেবলই সহায়তার পাত্রী নন, তাঁরা একেকজন দক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। স্থানীয় সরকার কাঠামো থেকে শুরু করে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন ফোরামে তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে তাঁদের সুপ্ত নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। আমরা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর-এর পক্ষ থেকে বিগত দিনেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার রক্ষা, শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করে আসছি। আমরা বিশ্বাস করি, আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন করা অসম্ভব।
Leave a Reply