
শান্তি আক্তার : নওগাঁ প্রতিনিধি নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার রসুলপুর পাড়ইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) মো. মাহবুব আলম ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগপত্রে যাকে ভুক্তভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই মো. আতাহার আলী (পল্টু) দাবি করেছেন, তিনি এ ধরনের কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করেননি। আতাহার আলীর দাবি, তার নাম, পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে কে বা কারা তার অজ্ঞাতে ওই অভিযোগ তৈরি করে দাখিল করেছে। বিষয়টি জানার পর তিনি অভিযোগের পেছনে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন বলেও দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি একজন দালাল। এ বিষয়ে তিনি নওগাঁ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে জানাবেন। সম্প্রতি করা ওই অভিযোগে বলা হয়েছিল, আতাহার আলীর স্ত্রী মোছা. হাফসা বেগমের জমির অনলাইন খাজনা পরিশোধের ক্ষেত্রে নায়েব মাহবুব আলমের পক্ষ থেকে বহিরাগত এক ব্যক্তির মাধ্যমে ৩৬ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। এমনকি ওই টাকার একটি অংশ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তাকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন আতাহার আলী। তিনি বলেন, “আমি কোনো লিখিত অভিযোগ দিইনি, এমনকি মৌখিকভাবেও কোনো অভিযোগ করিনি। আমার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে কে বা কারা জালিয়াতির মাধ্যমে এই অভিযোগ করেছে, তা জানতে পেরেছি। আমি ভূমি অফিসে গিয়ে কোনো হয়রানি ছাড়াই সেবা পেয়েছি। আমাকে কোনো ঘুষ বা অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়নি।” আতাহার আলী আরও বলেন, “যে ব্যক্তি অভিযোগটি দিয়েছে তাকে আমি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি একজন দালাল। তার বিষয়ে জেলা প্রশাসক স্যারকে লিখিতভাবে জানাবো।” অভিযোগের বিষয়ে রসুলপুর পাড়ইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম বলেন, ঘুষ চাওয়া বা অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি দাবি করেন, আব্দুল কাইয়ুম নামে এক ব্যক্তির জমি সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। মাহবুব আলমের ভাষ্য, আব্দুল কাইয়ুম হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকার বিষয়টি গোপন করে একটি নামজারি সম্পন্ন করেছিলেন। পরবর্তীতে অপরপক্ষ ওই নামজারির বিরুদ্ধে মিস কেস করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকার বিষয়টি তিনি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। মাহবুব আলম বলেন, “আমি অন্যায় করিনি। সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং আমি নির্দোষ প্রমাণিত হব—এটুকু ভরসা আমার আছে।” এদিকে স্থানীয় কয়েকজন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলেও অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। তাদের কয়েকজন জানান, নামজারি, খাজনা ও অন্যান্য ভূমিসেবা নিতে গিয়ে তারা অতিরিক্ত অর্থ প্রদান বা হয়রানির শিকার হননি। প্রায় ৬০ একর জমির মালিক এক সেবাগ্রহীতা জানান, তারা ছয় ভাই জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে নিয়মিত ভূমি অফিসে যান। তার দাবি, এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হননি এবং অতিরিক্ত টাকাও দিতে হয়নি। ভূমি অফিসসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা জিল্লুর রহমান বলেন, “ভূমি অফিসের পাশেই বাড়ি হওয়ায় নিয়মিত অফিসের কার্যক্রম দেখতে পাই। টাকা-পয়সা নিয়ে কারও সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে—এমন কিছু দেখিনি। নিজের জমির খাজনা-খারিজের কাজ করতেও অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়নি।” দামকুড়া এলাকার সেবাগ্রহীতা সালেক জানান, প্রায় দুই মাস আগে তার একটি জমির নামজারি সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে খাজনা পরিশোধ করেছেন। এ সময় কোনো হয়রানি বা অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের প্রয়োজন হয়নি বলে জানান তিনি। ভূমি অফিসসংলগ্ন এক কম্পিউটার দোকানদার জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন মানুষ ভূমি সংক্রান্ত সেবা নিতে অনলাইনে আবেদন করতে আসেন। তার দাবি, এখন পর্যন্ত কোনো সেবাগ্রহীতা দালাল, হয়রানি বা অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়ে তার কাছে অভিযোগ করেননি। তবে কোনো অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জান্নাত আরা তিথি বলেন, অভিযোগটির বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন। তিনি বলেন, “অভিযোগকারী অভিযোগ করেছেন কিনা, নাকি কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ দাখিল করেছেন এবং অভিযোগের সত্যতা রয়েছে কিনা—তদন্ত শেষে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তদন্ত শেষে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” অভিযোগকারী হিসেবে উল্লেখিত ব্যক্তি নিজেই অভিযোগ করার বিষয়টি অস্বীকার করায় এখন অভিযোগটির প্রকৃত উৎস, অভিযোগপত্রে ব্যবহৃত তথ্যের সত্যতা এবং এর পেছনে কারা জড়িত—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তবে অভিযোগটি সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা এবং অভিযোগটি মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, ভূমি অফিসের সরকারি রেকর্ড, আবেদন প্রক্রিয়া ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
Leave a Reply