
…………… যাদব চন্দ্র রায় ভূমিকা একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শিকার। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্র খরা, বন্যা এবং তাপপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের জীবন, জীবিকা এবং পরিবেশকে ক্রমাগত বিপন্ন করে তুলছে। এই বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথাগত কাঠামোগত বা প্রযুক্তিগত অভিযোজনের পাশাপাশি বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হিসেবে সামনে এসেছে ‘বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক অভিযোজন’ (Ecosystem-based Adaptation – EbA)। এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের টিকে থাকার এক সামগ্রিক ও টেকসই কৌশল। বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক অভিযোজন কী? বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক অভিযোজন হলো এমন একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, যা জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির নিজস্ব সেবাকে (Ecosystem Services) পুজি করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের সাথে মানুষকে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করে। এটি মূলত প্রকৃতির সুরক্ষার মাধ্যমে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি বিজ্ঞানসম্মত দর্শন। এর মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিবেশগত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা, যা জলবায়ুর ধাক্কা সামলানোর পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সাধন করবে। মূল উপাদান ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক অভিযোজন কোনো একক উদ্যোগ নয়, বরং এটি বিভিন্ন পরিবেশগত ব্যবস্থার সংরক্ষণ, টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং পুনরুদ্ধারের একটি সমন্বিত রূপ। এর প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিম্নরূপ: ১. বনভূমি সংরক্ষণ ও বনায়ন: বন কেবল কার্বন শোষণ করে না, বরং মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখে। টেকসই বনায়নের মাধ্যমে খরা ও অতিবৃষ্টির প্রভাব প্রশমন করা সম্ভব। ২. জলাভূমি ও নদী অববাহিকার টেকসই ব্যবস্থাপনা: হাওর, বিল ও পুকুরসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক জলাভূমি বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির উৎস হিসেবে কাজ করে। এগুলো পুনরুদ্ধার করলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ বাড়ে। ৩. উপকূলীয় সুরক্ষা: উপকূলবর্তী এলাকায় ম্যানগ্রোভ বা লবণাক্ততাসহিষ্ণু উদ্ভিদের প্রাচীর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমিয়ে দেয় এবং মাটির লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করে। ৪. জলবায়ু-সহিষ্ণু ও টেকসই কৃষি: কৃষিজমির সঠিক ব্যবহার, জৈব সারের প্রয়োগ এবং খরা বা বন্যা-সহিষ্ণু ফসলের চাষ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখে। এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাটির উর্বরতা দীর্ঘস্থায়ী করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এবং তৃণমূলের ভূমিকা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে দিনাজপুর ও বরেন্দ্র অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘকাল ধরে তীব্র খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই অঞ্চলের কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে বাঁচাতে বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক অভিযোজন অত্যন্ত জরুরি। তৃণমূল পর্যায়ে এই ধারণা বাস্তবায়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO) এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তৃণমূলের টেকসই উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ প্রতিষ্ঠান কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি), দিনাজপুর-এর নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (বিজেএসএস), দিনাজপুর জেলা শাখা-এর সভাপতি যাদব চন্দ্র রায়-এর মতো দূরদর্শী নেতৃত্ব এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। উন্নয়ন কর্মী হিসেবে সিডিসি-এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে প্রকৃতির সাথে সংগতি রেখে বাঁচতে শেখানো, জলাভূমি সংস্কার, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ পদ্ধতি ছড়িয়ে দেওয়ার বিশাল সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সংগঠন প্রধান হিসেবে গণমাধ্যমের লেখনীর মাধ্যমে বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক অভিযোজনের গুরুত্ব নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। উন্নয়ন ও সাংবাদিকতার এই মেলবন্ধন জলবায়ু সহনশীল সমাজ গঠনে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। উপসংহার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে পুরোপুরি রুখে দেওয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব, তবে প্রকৃতির নিয়মকে সম্মান জানিয়ে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া সম্ভব। বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক অভিযোজন আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতির ক্ষতি না করে, বরং প্রকৃতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দুর্যোগের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। বন, জলাভূমি ও কৃষিজমির টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা যদি পরিবেশের ক্ষতিপূরণ করতে পারি, তবে প্রকৃতিও আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেবে। জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং একটি সবুজ, নিরাপদ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে এই বাস্তবমুখী ও প্রকৃতি-বান্ধব অভিযোজন কৌশল বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। প্রবন্ধক: যাদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি), দিনাজপুর ও সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (বিজেএসএস), দিনাজপুর জেলা শাখা।
Leave a Reply