
শিশু অধিকার রক্ষায় ইএসজি (ESG) ও করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি: একটি সময়োপযোগী পর্যালোচনা প্রবন্ধক:
যাদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি), দিনাজপুর এবং সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (বিজেএসএস), দিনাজপুর জেলা শাখা। মোবাইল: ০১৭১৬৮৭৮৮৪৪, ই-মেইল: cdcdinajpur@yahoo.com ভূমিকা: বর্তমান বিশ্বায়ন ও আধুনিকায়ন-এর যুগে টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যবসায়িক ও করপোরেট খাতে ইএসজি (Environmental, Social, and Governance – ESG) ফ্রেমওয়ার্ক এবং করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি (Corporate Sustainability) একটি অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। একটি টেকসই সমাজ গঠনে ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য শুধু মুনাফা অর্জন নয়, বরং পরিবেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রকাশ করা। এই সামাজিক (Social) ও শাসনব্যবস্থা (Governance) স্তম্ভের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ প্রায়শই উপেক্ষিত দিক হলো “শিশু অধিকার”। শিশুরা যেকোনো জাতির ভবিষ্যৎ। তাই করপোরেট খাতের প্রতিটি পদক্ষেপে শিশু অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন আর কেবল দাতব্য কাজ নয়, বরং একটি আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা। ইএসজি (ESG) এবং শিশু অধিকারের আন্তঃসম্পর্ক: ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসন সংক্রান্ত নীতিমালার সাথে শিশু অধিকার ওতপ্রোতভাবে জড়িত: ১. পরিবেশগত দিক (Environmental): জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের সবচেয়ে বড় শিকার হয় শিশুরা। কলকারখানার বর্জ্য, বায়ুদূষণ এবং অনিরাপদ পানি শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। ইএসজি-র পরিবেশগত টেকসই নীতি শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। ২. সামাজিক দিক (Social): ইএসজি-র সামাজিক সূচকের মূল অংশজুড়ে রয়েছে মানবাধিকার। সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলে শিশু শ্রম নির্মূল করা, কর্মীদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করা যাতে তারা তাদের সন্তানদের সঠিক যত্ন ও শিক্ষা দিতে পারেন এবং শিশুদের উপযোগী নিরাপদ পণ্য ও সেবা উৎপাদন করা এই সূচকের অন্তর্ভুক্ত। ৩. শাসনব্যবস্থা (Governance): একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করে যে তারা শিশু অধিকার রক্ষায় কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিশু অধিকার রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা প্রণয়ন, স্বচ্ছতা, এবং যেকোনো ধরনের শিশু অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সুশাসনের অন্যতম দায়িত্ব। করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি এবং শিশু অধিকারের মূল ক্ষেত্রসমূহ: বিশ্বজুড়ে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের (UNCRC) আলোকে তাদের সাসটেইনেবিলিটি প্রতিবেদন তৈরি করছে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে শিশু অধিকারের প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিচে আলোচনা করা হলো: কর্মক্ষেত্রে শিশু শ্রমের সম্পূর্ণ অবসান: সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) বা মূল কারখানায় কোনো অবস্থাতেই যেন ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ বা সাধারণ শ্রমে নিয়োজিত না করা হয়, তা শতভাগ নিশ্চিত করা। কাজের পরিবেশ ও ডে-কেয়ার সুবিধা: কর্মজীবী পিতা-মাতার জন্য উপযুক্ত কর্মঘণ্টা, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ডে-কেয়ার বা শিশু যত্ন কেন্দ্রের সুবিধা প্রদান করা। এর ফলে শিশুরা তাদের প্রাথমিক বয়সে মায়ের দুধ ও সঠিক যত্ন থেকে বঞ্চিত হয় না। নিরাপদ পণ্য ও দায়িত্বশীল বিপণন: শিশুদের জন্য তৈরি খাদ্য, খেলনা বা পোশাক যেন স্বাস্থ্যসম্মত ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক মুক্ত হয়। এছাড়া, শিশুদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কোনো বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকারক বিজ্ঞাপন ও বিপণন নীতি পরিহার করা। কমিউনিটি উন্নয়ন ও শিক্ষা: করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহবিলের একটি বড় অংশ সুবিধাবঞ্চিত, পথশিশু ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির পেছনে ব্যয় করা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও করপোরেট খাতের ভূমিকা: বাংলাদেশ বর্তমানে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দ্রুত শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দিনাজপুরসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তিক অঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে। তবে এখনো দেশের অনেক অনানুষ্ঠানিক খাতে বা ক্ষুদ্র শিল্পে শিশু শ্রমের উপস্থিতি দেখা যায়। এই বাস্তবতায়, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সাসটেইনেবিলিটি প্রতিবেদনে শিশু অধিকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারি নজরদারির পাশাপাশি করপোরেট খাতের স্বপ্রণোদিত অংশগ্রহণই পারে একটি শিশু-বান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করতে। সুপারিশমালা ও করণীয়: ১. সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্টে অন্তর্ভুক্তি: প্রতিটি মাঝারি ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদনে শিশু অধিকার সুরক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপগুলো (যেমন- চাইল্ড লেবার ফ্রি সার্টিফিকেশন) আলাদা অধ্যায় হিসেবে প্রকাশ করা উচিত। ২. নিয়মিত অডিট ও মনিটরিং: সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনো শিশু অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা তা যাচাই করতে স্বাধীন থার্ড-পার্টি অডিটের ব্যবস্থা করা। ৩. যৌথ অংশীদারিত্ব: করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা (NGO) ও নাগরিক সমাজের সাথে যুক্ত হয়ে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প গ্রহণ করা। উপসংহার: শিশু অধিকার রক্ষা কেবল একটি আইনি দায়িত্ব নয়, এটি একটি টেকসই ও বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি। যে করপোরেট প্রতিষ্ঠান আজ শিশুর সুরক্ষায় বিনিয়োগ করবে, দীর্ঘমেয়াদে তারাই সমাজে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও টেকসই ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের (ESG) মাধ্যমে আমরা যদি আমাদের শিশুদের একটি নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় শৈশব উপহার দিতে পারি, তবেই আমাদের উন্নয়ন টেকসই ও অর্থপূর্ণ হবে। আসুন, ব্যবসায়ের মুনাফার পাশাপাশি প্রতিটি শিশুর অধিকার সুরক্ষায় আমরা একযোগে কাজ করি।
Leave a Reply