
শিশুবিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়…………………………………
প্রবন্ধক:
যাদব চন্দ্র রায়
নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর
ও
সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা ট্রাস্ট (BJSST), দিনাজপুর জেলা শাখা
মোবাইল: ০১৭১৬৮৭৮৮৪৪, ই-মেইল: cdcdinajpur@yahoo.com
ভূমিকা:
একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে সেই দেশের নারী ও পুরুষ উভয় জনগোষ্ঠীর সমঅধিকার এবং সমঅংশগ্রহণের ওপর। বিশেষ করে আজকের কন্যাশিশুই আগামী দিনের সুনাগরিক, মা এবং দেশ গড়ার কারিগর। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা নানা কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের কারণে কন্যাশিশুরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিশাপের নাম ‘বাল্যবিয়ে’। এই অন্ধকার থেকে উত্তরণের বলিষ্ঠ প্রত্যয় নিয়ে আজ স্লোগান উঠেছে— “শিশুবিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়”। এই স্লোগান কেবল একটি বাক্য নয়, এটি একটি সামাজিক বিপ্লবের ডাক এবং নারীর ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত।
বাল্যবিয়ে কী এবং এর প্রেক্ষাপট:
আইনত বিয়ের জন্য নির্ধারিত বয়সের (সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৮ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছর) আগে বিয়ে হওয়াকে বাল্যবিয়ে বা শিশুবিয়ে বলা হয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দারিদ্র্য, অসচেতনতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং কুসংস্কারের কারণে বাল্যবিয়ের হার আশঙ্কাজনক। অনেক পরিবার কন্যাশিশুকে ‘পারিবারিক বোঝা’ মনে করে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দায়িত্বমুক্ত হতে চায়। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী চিন্তা একটি মেয়ের জীবনের সব সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়।
কন্যাশিশুর বিশ্বজয়ের সম্ভাবনা ও অন্তরায়:
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তি ও মেধার যুগ। সুযোগ পেলে আমাদের দেশের কন্যারা শিক্ষায়, খেলাধুলায়, রাজনীতিতে ও বিজ্ঞানে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছে। হিমালয় জয় থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা, এভারেস্ট জয় থেকে শুরু করে ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাস— সবখানেই আজ কন্যাদের পদচারণা। কিন্তু বাল্যবিয়ে এই সম্ভাবনার পথে সবচেয়ে বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। একটি মেয়ের যখন স্কুলে যাওয়ার কথা, নতুন পৃথিবী চেনার কথা, তখন তাকে ঠেলে দেওয়া হয় সংসার ও সন্তান পালনের কঠিন বাস্তবতায়। বাল্যবিয়ে একটি মেয়ের শিক্ষার আলো কেড়ে নেয়, তার স্বপ্নগুলোকে হত্যা করে এবং তাকে সারাজীবনের জন্য পরাধীন ও পরনির্ভরশীল করে তোলে।
বাল্যবিয়ের স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক প্রভাব:
শারীরিক ও মানসিকভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ের ফলে একটি মেয়ের শরীরে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে মা ও শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অপুষ্টি ও জরায়ু ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয় এই কিশোরী মায়েরা। এছাড়া, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের বলি হওয়া এবং মানসিক বিষণ্নতা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিকভাবে এটি একটি জাতিকে পেছনের দিকে টেনে ধরে, কারণ একজন অশিক্ষিত ও অপুষ্টিতে ভোগা মা কখনো একটি সুস্থ ও শিক্ষিত প্রজন্ম উপহার দিতে পারেন না।
প্রতিরোধে আমাদের করণীয়:
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন।
শিক্ষার প্রসার: কন্যাশিশুদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা একটি মেয়েকে সচেতন ও স্বাবলম্বী করে তোলে।
সামাজিক সচেতনতা: গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে উঠান বৈঠক, সেমিনার এবং গণমাধ্যমের সাহায্যে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে।
আইনের কঠোর প্রয়োগ: বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের যথাযথ ও কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কাজী, ইমাম, পুরোহিত এবং বিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে।
কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগ: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO), সুশীল সমাজ ও সাংবাদিকদের স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোথাও বাল্যবিয়ের আয়োজন হলে তা দ্রুত রুখে দেওয়া যায়।
CDC ও BJSST এর ভূমিকা ও প্রত্যয়:
কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC) এবং বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা ট্রাস্ট (BJSST), দিনাজপুর জেলা শাখা দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কাজ করে আসছে। দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বাল্যবিয়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা বিশ্বাস করি, সাংবাদিকদের কলম এবং উন্নয়ন সংস্থার মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম একসূত্রে গাঁথলে সমাজ থেকে এই অন্ধকার দূর করা সম্ভব। আমরা প্রতিটি কন্যাশিশুর জন্য একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন এবং আশাব্যঞ্জক পরিবেশ তৈরি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে কোনো শিশুবিয়ে তাদের ডানা ভাঙতে পারবে না।
উপসংহার:
কন্যাশিশু কোনো বোঝা নয়, সে আমাদের সম্পদ ও গর্ব। তাকে অবহেলা করে বা ঘরের কোণে বন্দি রেখে কোনো দেশ উন্নত হতে পারে না। বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে পারলে প্রতিটি কন্যা তার সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারবে। আমাদের সম্মিলিত প্রতিজ্ঞা হতে হবে— আমরা আর কোনো কন্যাশিশুর স্বপ্নকে বাল্যবিয়ের আগুনে পুড়তে দেব না। তাদের দেব সঠিক শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং এগিয়ে যাওয়ার সাহস। তবেই সার্থক হবে আমাদের অঙ্গীকার, অবসান ঘটবে শিশুবিয়ের আর আমাদের কন্যারা আত্মবিশ্বাসের সাথে বিশ্বজয় করবে।
Leave a Reply