
: টেকসই অভিযোজন ও আমাদের করণীয় যদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর এবং সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (BJSS), দিনাজপুর জেলা শাখা বর্তমান বিশ্বে মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় হুমকির নাম জলবায়ু পরিবর্তন। ভৌগোলিক অবস্থান, অতি-জনঘনত্ব এবং প্রকৃতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে মারাত্মক শিকার আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে এ দেশের কৃষি ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। অথচ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড এবং খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তিই হলো কৃষি। জলবায়ুর এই আকস্মিক ও নেতিবাচক পরিবর্তন আমাদের সেই ভিত্তিমূলেই আঘাত হানছে। অঞ্চলভেদে জলবায়ুর বহুমুখী ঝুঁকি বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ হলেও এর ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। প্রধানত দুটি অঞ্চলে এই ঝুঁকির তীব্রতা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়: ১. উত্তরাঞ্চলের সংকট (খরা ও পানির স্তর নেমে যাওয়া): আমাদের উত্তরাঞ্চল তথা বরেন্দ্র এলাকা আজ চরম খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কবলে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমেও আগের মতো সময়মতো বৃষ্টি হচ্ছে না, আবার অসময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে। দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে, যা সেচ-ভিত্তিক কৃষি উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ২. দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংকট (লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা): অন্যদিকে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আরও ভয়াবহ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ফসলি জমিতে ও ভূগর্ভস্থ পানিতে তীব্র লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। ফলে বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমি আবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এবং লাখ লাখ মানুষ তাদের পৈতৃক জীবিকা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছে। জলবায়ু-সহনশীল কৃষি চর্চা ও প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা ঐতিহ্যগত কৃষি পদ্ধতি দিয়ে জলবায়ুর এই ভয়াল থাবাকে মোকাবিলা করা অসম্ভব। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো—স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জলবায়ু-সহনশীল কৃষি চর্চা (Climate-Smart Agriculture) এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ। উত্তরাঞ্চলের জন্য প্রযুক্তি: খরাপ্রবণ উত্তরাঞ্চলে কম পানি লাগে এমন ফসলের চাষ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) উদ্ভাবিত খরা-সহনশীল ধানের জাত (যেমন- ব্রি ধান ৫৬, ব্রি ধান ৫৭, ব্রি ধান ৭১ ইত্যাদি) চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ফোঁটা ফোঁটা সেচ পদ্ধতি (Drip Irrigation) এবং বৃষ্টির পানি ধরে রেখে (Rainwater Harvesting) ব্যবহারের ব্যবহারিক জ্ঞান কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য প্রযুক্তি: উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা-সহনশীল ধানের জাত (যেমন- ব্রি ধান ৪৭, ব্রি ধান ৬৭, ব্রি ধান ৯৭) এবং সবজি চাষ সম্প্রসারণ করতে হবে। জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান বেডে সবজি চাষ (ধাপ চাষ) এবং একই জমিতে সমন্বিত মাছ ও ধান চাষের (Gher Farming) মতো স্থানীয়ভাবে উপযোগী প্রযুক্তিগুলোর বিস্তার ঘটাতে হবে। সঠিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের গুরুত্ব জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা তখনই সফল হবে, যখন মাঠ পর্যায়ের প্রান্তিক কৃষকদের কাছে এর সঠিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। অনেক সময় উন্নত জাত বা প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হলেও তথ্যের অভাবে প্রান্তিক কৃষক তা সময়মতো ব্যবহার করতে পারেন না। এজন্য সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO) এবং গণমাধ্যমকে একসাথে কাজ করতে হবে। উঠান বৈঠক, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী খামার স্থাপন এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির (যেমন- মোবাইল অ্যাপ বা কৃষি কল সেন্টার) মাধ্যমে কৃষকদের জলবায়ুর পূর্বাভাস ও করণীয় সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। আমাদের ভূমিকা ও সমাপনী ভাবনা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুরের মতো স্থানীয় সামাজিক ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো মাঠ পর্যায়ে প্রান্তিক মানুষের জীবিকা সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। তবে এই বিশাল চ্যালেঞ্জ এককভাবে কোনো সংস্থার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। একই সাথে, সাংবাদিক সমাজেরও এখানে একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (BJSS)-এর মতো পেশাদার সংগঠনগুলোর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের স্থানীয় প্রভাব, কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি এবং সফল অভিযোজনের গল্পগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে হবে। মিডিয়ার জোরালো ভূমিকা নীতিনির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দে বাধ্য করতে পারে। কৃষি আমাদের জীবন, আমাদের সংস্কৃতি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে মোকাবিলা করে আমাদের মাটির উর্বরতা ও কৃষকের শ্রমকে বাঁচাতে হলে এখনই সমন্বিত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। স্থানীয় বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে পরিবেশ-বান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল আমরা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং গ্রামীণ জীবিকাকে সুরক্ষিত রাখতে পারব।
Leave a Reply