
বাক্স্বাধীনতা যেন হ্রাস পেয়ে যাচ্ছে — যাদব চন্দ্র রায় (নির্বাহী পরিচালক, CDC, দিনাজপুর ও সাংবাদিক).….. ভূমিকা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো মানুষের চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা। গণতন্ত্র তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ—বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—কোনো ভয় বা দ্বিধা ছাড়াই নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব এবং সমসাময়িক সামাজিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি উদ্বেগজনক সত্য সামনে আসে—তা হলো, মানুষের মৌলিক অধিকার ‘বাক্স্বাধীনতা’ দিন দিন যেন সংকুচিত বা হ্রাস পেয়ে যাচ্ছে। বাক্স্বাধীনতা কী এবং কেন এটি হ্রাস পাচ্ছে? সহজ কথায় বাক্স্বাধীনতা হলো নিজের চিন্তা, বিশ্বাস এবং মতামতকে কোনো বাধা বা শাস্তির ভয় ছাড়া মৌখিক বা লিখিতভাবে প্রকাশ করার অধিকার। “বাক্ স্বাধীনতা হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রাণ এবং নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার।” — বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন হলেও, পরোক্ষভাবে মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে। বিভিন্ন আইনি জটিলতা, ডিজিটাল নজরদারি, মনস্তাত্ত্বিক ভয় এবং অসহিষ্ণুতার কারণে সাধারণ মানুষ এখন সত্য বলতে বা যৌক্তিক সমালোচনা করতে ভয় পাচ্ছে। সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ না করার এই সংস্কৃতি বাক্স্বাধীনতা হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ। সাংবাদিকতা ও সমাজ উন্নয়নে এর প্রভাব একজন সাংবাদিক ও সমাজকর্মী হিসেবে আমি প্রতিদিন মাঠপর্যায়ে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও অধিকারের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করি। যখন সংবাদমাধ্যম বা তৃণমূলের অধিকারকর্মী ও সাধারণ জনগণের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়, তখন সমাজ তথা রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। দুর্নীতি, অনিয়ম এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে যদি কথা বলা না যায়, তবে জবাবদিহিতা হারিয়ে যায়। গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি উন্মুক্ত পরিবেশ, যেখানে সবাই নির্ভয়ে নিজের অধিকারের দাবি জানাতে পারবে। বাক্স্বাধীনতা হ্রাসের সামাজিক পরিণতি বাক্স্বাধীনতা কমে যাওয়ার অর্থ হলো একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক মৃত্যু ঘটা। যখন মানুষ তার মৌলিক অধিকার বা কোনো অসংগতির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারে না, তখন সমাজে এক ধরণের কৃত্রিম নীরবতা ও ক্ষোভের জন্ম নেয়। এটি সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ এবং মুক্তচিন্তার ধারাকে চরমভাবে ব্যাহত করে। সত্য আড়াল করে কোনো সমাজ বা জাতি দীর্ঘমেয়াদে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। উত্তরণের উপায় ও উপসংহার বাক্স্বাধীনতার অপব্যবহার যেমন কাম্য নয়, তেমনি কোনো অজুহাতে একে অবদমিত দেখাও গ্রহণযোগ্য নয়। এটি ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সুশীল সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। সমালোচনার অধিকারকে সম্মান জানানো এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হওয়া একটি সুস্থ সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজের সামগ্রিক মুক্তি এবং টেকসই সামাজিক উন্নয়নের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ও মুক্তভাবে কথা বলার অধিকারের মধ্যে। বাক্স্বাধীনতা কোনো দয়া বা অনুকম্পা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের জন্মগত সাংবিধানিক অধিকার।
Leave a Reply