
আগামী প্রজন্মের অধিকার ও টেকসই উন্নয়ন: সংকটে ও সম্ভাবনায় আমাদের শিশুরা……………………………………………………………………… প্রবন্ধক: যাদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (BJSS), দিনাজপুর জেলা শাখা যোগাযোগ: মোবাইল: ০১৭১৬৮৭৮৮৪৪, ই-মেইল: cdcdinajpur@yahoo.com ভূমিকা: আজকের শিশু আগামী দিনের পৃথিবীর রূপকার। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়নের যত আলাপ-আলোচনা, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিশু অধিকার ও তাদের সার্বিক কল্যাণ। বর্তমান পরিবর্তনশীল বিশ্ব প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে শিশুদের কেবল সুরক্ষার পাত্র হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং তাদের পরিবর্তনের সক্রিয় প্রতিনিধি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, জেন্ডার বৈষম্য এবং শরণার্থী সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি শিশু চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এই বাস্তবতায় শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের একটি নিরাপদ পৃথিবী উপহার দেওয়া আমাদের যৌথ নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। ১. পরিবর্তনের প্রতিনিধি শিশু (Children as Agents of Change): শিশুরা কেবল ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, তারা বর্তমানেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। সঠিক সুযোগ ও পরিবেশ পেলে শিশুরা নিজেদের অধিকার সচেতন সমাজ গঠনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশ রক্ষা, বাল্যবিয়ে রোধ, এবং বিদ্যালয়ে সহপাঠীদের অধিকার রক্ষায় বিশ্বজুড়ে শিশুরা আজ নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের এই উদ্ভাবনী শক্তি এবং সাহসী কণ্ঠস্বরকে সমাজের মূল স্রোতে জায়গা দিতে হবে, যাতে তারা সমাজ পরিবর্তনের সক্রিয় কারিগর বা ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ২. ঝুঁকিতে থাকা শিশু (Children at Risk): দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, শিশুশ্রম, এবং পাচারের শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত অসংখ্য শিশু তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পথশিশু, গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত শিশু এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত ও ঝুঁকির মধ্যে বাস করে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় এই শিশুরা প্রতিনিয়ত বঞ্চনা ও শোষণের শিকার হচ্ছে, যা তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক বিকাশকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। ৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও শিশু (Climate Change and Children): বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ এবং এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশের নিরীহ শিশুরা। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তীব্র তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং নদীভাঙনের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি শিশুর ভবিষ্যৎ আজ চরম হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি শিশুদের শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা তাদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে। ৪. শিক্ষা এবং শিশু (Education and Children): শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মৌলিক ও অলঙ্ঘনীয় অধিকার। বৈষম্যহীন মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া কোনো শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব নয়। তবে করোনা মহামারীর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনেক শিশুই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর পার হওয়ার আগেই ঝরে পড়ছে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও জীবনমুখী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ৫. জেন্ডার সমতা (Gender Equality): একটি সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে কন্যাশিশু ও ছেলেশিশুর সমান অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আমাদের সমাজে এখনও কন্যাশিশুরা পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়। বাল্যবিয়ে কন্যাশিশুদের জীবনের একটি বড় অভিশাপ, যা তাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের ইতি টানে। জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার অর্থ হলো—আইনগত ও সামাজিকভাবে কন্যাশিশুদের এমন এক নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া, যেখানে তারা ছেলেদের মতোই সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিয়ে বড় হতে পারবে। ৬. রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু (Rohingya Refugee Children): মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে একটি বড় অংশই অবোধ শিশু। শরণার্থী শিবিরের ঘিঞ্জি পরিবেশ, পুষ্টিহীনতা, এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এই রোহিঙ্গা শিশুদের শৈশবকে বিপন্ন করে তুলেছে। এই শিশুদের মানবিক অধিকার, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক ট্রমা কাটিয়ে ওঠার জন্য বিশেষায়িত শিশু-বান্ধব পরিবেশ ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় দায়িত্ব। শিশু অধিকার ও কল্যাণ বিষয়ক সেরা বাণিজ্য প্রতিবেদন (মিডিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা): শিশু অধিকার রক্ষায় করপোরেট সেক্টর এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহবিল শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে ব্যবহারের মাধ্যমে একটি টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব। একই সাথে, গণমাধ্যমে শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন ও কল্যাণের বিষয়গুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে এবং যৌক্তিকভাবে তুলে ধরতে হবে। “শিশু অধিকার ও কল্যাণ বিষয়ক সেরা বাণিজ্য প্রতিবেদন” কেবল একটি স্বীকৃতি নয়, এটি মূলত করপোরেট জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এবং শিশুশ্রম মুক্ত শিল্পকারখানা গড়ে তোলার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। শিশু অধিকার: সাধারণ বিভাগ ও আমাদের করণীয়: জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (UNCRC) অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর বেঁচে থাকা, সুরক্ষা, বিকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে। এই অধিকারগুলো বাস্তবায়নে রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (NGO) সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আইনের কঠোর প্রয়োগ: শিশুশ্রম এবং শিশু নির্যাতন বিরোধী আইনের শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি: জাতীয় বাজেটে শিশু স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুরক্ষামূলক কার্যক্রমে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা: বিশেষ করে দিনাজপুরসহ দেশের প্রান্তিক জেলাগুলোতে কমিউনিটি-ভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাল্যবিয়ে ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ করতে হবে। উপসংহার শিশুদের উন্নয়ন ও কল্যাণ ব্যতিরেকে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের পক্ষে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন করা সম্ভব নয়। আমরা যদি জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবেলা করে শিশুদের জন্য একটি সমতাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে পারি, তবেই তারা প্রকৃত অর্থে ‘পরিবর্তনের প্রতিনিধি’ হয়ে উঠবে। আসুন, দল-মত নির্বিশেষে আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে শিশুর অধিকার সুরক্ষায় অঙ্গীকারাবদ্ধ হই এবং তাদের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়ে তুলি।
Leave a Reply