— যাদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর এবং সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (BJSS), দিনাজপুর শাখা। বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর অন্যতম। তবে এই জলবায়ু সংকটের রূপ দেশের সব অঞ্চলে একরকম নয়। উপকূলীয় অঞ্চলে যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা প্রধান সমস্যা, তখন আমাদের বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে বৃহত্তর দিনাজপুর এবং রংপুর বিভাগ সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চরম এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন এখন তীব্র খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়া এবং শীতকালে চরম শৈত্যপ্রবাহের মতো জলবায়ুগত চরমভাবাপন্নতার মুখোমুখি। এই বহুমাত্রিক সংকট কেবল প্রকৃতির ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, বরং এ অঞ্চলের কৃষি, জীবনজীবিকা এবং বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কৃষির ওপর আঘাত ও জীবিকার সংকট উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে বলা হয় বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার একটি বিশাল অংশ নিশ্চিত করে এই অঞ্চলের উৎপাদিত ধান, গম, আলু এবং আম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এখন এ অঞ্চলের নিয়মিত চিত্র। আমন বা বোরো মৌসুমে যখন পানির তীব্র প্রয়োজন, তখন দেখা দিচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত খরা। ফলে কৃষকদের সম্পূর্ণভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত সেচের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর (Water Table) আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে, যার ফলে সাধারণ নলকূপ তো বটেই, গভীর নলকূপগুলোও শুষ্ক মৌসুমে পানি তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। পানির এই তীব্র সংকট একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদনকে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে, অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষক ও দিনমজুরদের ঠেলে দিচ্ছে কর্মহীনতার দিকে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের সংকট দিনাজপুর ও রংপুর বিভাগে বহুসংখ্যক আদিবাসী (নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী) বসবাস করেন, যাদের জীবন ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতি এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম ও সবচেয়ে মারাত্মক আঘাতটি আসছে তাদের ওপরই। খরা ও পানির সংকটের কারণে তাদের ঐতিহ্যগত কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। প্রথাগত পেশা হারিয়ে অনেকেই ভূমিহীন ও কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল এই জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। যুব সমাজ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব এই জলবায়ু সংকট তরুণ ও যুব সমাজের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় গ্রামীণ যুবকদের মাঝে বেকারত্ব বাড়ছে, যার ফলে তারা বাধ্য হয়ে দলবেঁধে শহরের দিকে অভিবাসী (Climate Refugees) হচ্ছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্থানান্তর গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। সবচেয়ে মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া—যেমন তীব্র দাবদাহ কিংবা হাড়কাঁপানো শৈত্যপ্রবাহের সময় তাদের গতিশীলতা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। দুর্যোগের সময় তাদের স্বাস্থ্যসেবা ও সুপেয় পানির অধিকার নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচিগুলোতেও অনেক সময় এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের প্রয়োজনীয়তাকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, যা তাদের আরও বেশি অসহায় করে তোলে। সংকট উত্তরণে আমাদের করণীয় ও টেকসই সমাধান এই চরম সংকট থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে রক্ষা করতে হলে এখনই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে: ১. পানির টেকসই ব্যবহার: ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting) এবং উপরিভাগের পানির উৎস যেমন—পুকুর, দীঘি ও খাল-নদী পুনখনন করে পানির ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে। ২. জলবায়ু-সহনশীল কৃষি: খরা-সহনশীল এবং কম পানিতে চাষ করা যায় এমন আধুনিক ফসলের জাত (যেমন—খরা সহনশীল ধান) কৃষকদের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। ৩. অন্তর্ভুক্তিমূলক অভিযোজন (Inclusive Adaptation): যেকোনো জলবায়ু মোকাবিলা প্রকল্পে আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যুব সমাজ এবং বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ৪. সামাজিক সচেতনতা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা: জলবায়ু পরিবর্তনের এই নীরব সংহার রূপকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে গণমাধ্যম এবং সুশীল সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। উপসংহার: দিনাজপুর ও রংপুর বিভাগের এই জলবায়ু সংকট কেবল কোনো আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে জড়িত। আমাদের প্রতিষ্ঠান কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC) তৃণমূল পর্যায়ে প্রান্তিক মানুষের অধিকার ও টেকসই উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। একই সাথে বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (BJSS) -এর মাধ্যমে আমরা এই বিপন্ন মানুষের কণ্ঠস্বরকে নীতি-নির্ধারকদের কান পর্যন্ত পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। সরকারের পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে এখনই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশেষ নজর দিতে হবে। তবেই রক্ষা পাবে আমাদের শস্যভাণ্ডার, সুরক্ষিত হবে আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী ভাইবোনদের অধিকার, আর যুব সমাজ ফিরে পাবে তাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।
Leave a Reply