
যাদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (CDC), দিনাজপুর ও সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (BJSS), দিনাজপুর জেলা শাখা প্রকৃতি যখন কথা বলে, তখন মানুষের তৈরি সমস্ত অহংকার, প্রযুক্তি আর দালানকোঠা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে নেপালের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস যেন বিশ্ববাসীকে সেই চিরন্তন সত্যটিই আবারও বুক কাঁপিয়ে জানিয়ে দিল—প্রকৃতি আজ মানুষের ওপর চরম বিমুখ। যে হিমালয় দুহাত ভরে সৌন্দর্য আর আশীর্বাদ বিলিয়ে দিত, জলবায়ু পরিবর্তনের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় সেই হিমালয়ের কোল আজ ভেসে যাচ্ছে স্বজনহারা মানুষের কান্না আর হাহাকারে। এই দৃশ্য শুধু নেপালের একার নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক জলজ্যান্ত সতর্কবার্তা। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমরা খুব ভালো করেই জানি, পাহাড়ি ঢল আর বন্যার এই তাণ্ডব কতটা বুকভাঙা যাতনা বয়ে আনে। যখন একটি সাজানো সংসার, এক টুকরো ফসলি জমি কিংবা কোনো মায়ের কোল নিমেষেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, তখন হৃদয়ে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়—তার কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না। নেপালের এই বিপন্নতা আজ প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে, একাত্ম করেছে গভীর বেদনায়। বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলে আসছিলেন, তা আজ আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা কিংবা দূর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। এটি আমাদের দরজায় কড়া নাড়া এক নির্মম বর্তমান। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, হিমবাহের অকাল গলন আর প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ আসলে মানুষেরই লাগামহীন লোভ আর অসচেতনতার ফল। আমরা উন্নয়ন করেছি, কিন্তু প্রকৃতিকে ধ্বংস করে। আর তারই খেসারত দিতে হচ্ছে হিমালয়ের পাদদেশের নিরীহ মানুষদের। নেপালের এই মহা দুর্যোগ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ দিয়ে এই মহাবিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এখন সময় এসেছে বিশ্বজুড়ে সমষ্টিগত পরিকল্পনা ও তার দ্রুত বাস্তবায়নের। পরিবেশ রক্ষা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং দুর্যোগ সহনশীল টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বনেতাদের শুধু কাগজের প্রতিশ্রুতিতে আটকে থাকলে চলবে না, তা দ্রুত মাঠে নামাতে হবে। সীমান্ত যতই ভিন্ন হোক না কেন, জলবায়ুর এই মরণকামড় থেকে বাঁচতে হলে দক্ষিণ এশিয়া তথা সমগ্র বিশ্বকে এক সুতোয় গাঁথতে হবে। সমষ্টিগত প্রতিরোধই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ পৃথিবী উপহার দিতে। নেপালের পাহাড়গুলো আজ ক্ষতবিক্ষত, উপত্যকাগুলো কাঁদছে। কিন্তু মানুষ তো দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ইতিহাসের প্রতিটি দুর্যোগেই মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প আছে। আমরা বিশ্বাস করি, নেপালের এই স্তব্ধতা কেটে যাবে। প্রকৃতির এই বৈরিতাকে জয় করে, বুকভরা সাহস আর বিশ্ববাসীর সহযোগিতায় নেপাল আবার হেসে উঠবে। হিমালয়ের কোলে আবার ফিরবে প্রাণের স্পন্দন, মুখরিত হবে পর্যটকদের কোলাহলে। আমাদের প্রার্থনা আর সংহতি রইল নেপালের প্রতিটি লড়াকু মানুষের জন্য। নেপাল ঘুরে দাঁড়াক, প্রকৃতি আবার শান্ত হোক, আর মানুষ তার ভুল শুধরে প্রকৃতির সঙ্গে পরম মৈত্রীতে বাঁচতে শিখুক—আজকের দিনে হৃদয়ের গভীর থেকে এটাই একমাত্র আকুল কামনা।
Leave a Reply