
দুর্যোগ মোকাবিলা, প্রস্তুতি ও টেকসই উন্নয়ন: নিরাপদ ও সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার……………………………………….. প্রবন্ধক: যাদব চন্দ্র রায় নির্বাহী পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি), দিনাজপুর এবং সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (বিজেএসএস), দিনাজপুর জেলা শাখা। মোবাইল: ০১৭১৬৮৭৮৮৪৪, ই-মেইল: cdcdinajpur@yahoo.com ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, ভূমিকম্প এবং নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করে। তবে বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা যেমন লড়াকু, তেমনই আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলা ও অভিযোজনের সক্ষমতাও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি নিরাপদ, পূর্ব-প্রস্তুত এবং টেকসই বা সহনশীল (Resilient) বাংলাদেশ গড়ে তোলা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। একটি দুর্যোগ-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে প্রধানত তিনটি স্তম্ভের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন: সচেতনতা ও পূর্ব-প্রস্তুতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার মূল চাবিকাঠি হলো ‘পূর্ব-প্রস্তুতি’। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য ও সতর্কবার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে জীবন ও সম্পদের হানি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রারম্ভিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থার (Early Warning System) আধুনিকায়ন জরুরি। তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি পরিবার যেন দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়ার পর কী করণীয় তা আগে থেকেই জানে, সেই ব্যাপারে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। নিয়মিত মক ড্রিল বা মহড়া, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সহজলভ্যতা এবং জরুরি সাড়াদানকারী দলগুলোকে (First Responders) প্রশিক্ষিত করে তোলা এই প্রস্তুতিরই অংশ। দ্বিতীয়ত, আমাদের অবকাঠামোগতভাবে নিরাপদ হতে হবে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, জলবায়ু-সহনশীল ঘরবাড়ি তৈরি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগর ও গ্রামাঞ্চলে অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তরবঙ্গে খরার প্রবণতা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও জলোচ্ছ্বাসের যে তীব্রতা দেখা যাচ্ছে, তা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা প্ল্যান বা বদ্বীপ পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তবে যেকোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে। একটি এলাকা দুর্যোগের মুখে কতটা টিকে থাকতে পারবে, তা নির্ভর করে সেই এলাকার মানুষের নিজস্ব সক্ষমতা ও প্রস্তুতির ওপর। আর এখানেই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO) এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা অনন্য হয়ে ওঠে। মাঠপর্যায়ে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় সচেতনতা পৌঁছে দেওয়া, নারীদের নেতৃত্ব গড়ে তোলা, প্রতিবন্ধী ও শিশুদের বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা করা এবং স্থানীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আপৎকালীন তহবিল গঠন করার ক্ষেত্রে ‘কমিউিনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি), দিনাজপুর’-এর মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। স্থানীয় জ্ঞানের সাথে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে সিডিসি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী ও দুর্যোগ-সহনশীল করে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। একই সাথে, একটি নিরাপদ ও সচেতন সমাজ গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সঠিক তথ্য প্রচার, দুর্যোগের সময় গুজব রোধ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী মানবিক সহায়তার চিত্র তুলে ধরতে সাংবাদিক সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ‘বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা (বিজেএসএস)’ জনকল্যাণমুখী সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজকে জাগ্রত ও সচেতন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গণমাধ্যম যখন দুর্যোগ প্রস্তুতির বার্তা সাধারণ মানুষের ভাষায় তুলে ধরে, তখন জনসচেতনতা একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। পরিশেষে বলা যায়, নিরাপদ ও সহনশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম, গণমাধ্যমের বলিষ্ঠ ভূমিকা এবং আপামর জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আমরা যদি প্রতিটি স্তরে দুর্যোগ সাড়াদান ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, তবেই গড়ে উঠবে একটি নিরাপদ, আত্মবিশ্বাসী ও দুর্যোগ-প্রস্তুত বাংলাদেশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুরক্ষিত ও বাসযোগ্য মাতৃভূমি রেখে যাওয়াই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
Leave a Reply